
চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিতি ও সেবার মান যাচাই করতে নরসিংদীর পলাশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন (বকুল)। আজ শনিবার সকালে পূর্বঘোষণা ও প্রটোকল ছাড়াই ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনি হাজির হন। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা হাসপাতালে অবস্থান করেও কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সকাল সাড়ে আটটার দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রবেশ করলে সাধারণ রোগীরা জড়ো হন। হাসপাতালে প্রবেশ করেই মন্ত্রী সরাসরি হাজিরা খাতা ও ডিউটি রোস্টার যাচাই করেন। এতে দেখেন, বেশির ভাগ চিকিৎসক ও কর্মকর্তা কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
এরপর জরুরি বিভাগ, প্যাথলজি ল্যাব ও বহির্বিভাগ ঘুরে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ওষুধের মজুত ঠিক আছে কি না, যাচাই করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। পরে সরাসরি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন মন্ত্রী।
এ সময় সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে একটি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন হওয়ায় ভেবেছিলাম, সব ডাক্তারকে পাব। সাতজন ডাক্তারকে অনুপস্থিত পেয়েছি। আলোচনা করে নিয়ম অনুযায়ী যা করা দরকার, তা–ই করব। প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা সহ্য করা হবে না।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ, ঘোড়াশাল পৌরসভা বিএনপির সভাপতি আলম মোল্লা, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম, হাসপাতালটির আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আবদুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।
চিকিৎসকদের অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২১ জন চিকিৎসকের মধ্যে ৫ জন দেরি করে হাসপাতালে এসেছেন আর ২ জন অনুপস্থিত। বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, দেরি করে আসা চিকিৎসকেরা কেউ সাড়ে ৯টা, কেউ পৌনে ১০টায় হাসপাতালে এসেছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিলল নানা অনিয়ম
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হঠাৎ করেই স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ঝটিকা পরিদর্শনে ধরা পড়ে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি। ছুটির অনুমোদনের অসংগতি এবং হাসপাতালের সেবাব্যবস্থার নানা ঘাটতি।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে প্রতিদিনের মতোই কার্যক্রম চলছিল কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এ সময় হঠাৎ করেই পুলিশ প্রটোকলসহ একটি সাদা গাড়ি হাসপাতাল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি হাসপাতালে ঢুকে পড়েন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
হাসপাতালে প্রবেশ করেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী কর্তব্যরতদের কাছে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার অফিস কোথায় জানতে চান। পরে ওই কক্ষে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক রেজওয়ানা রশিদকে অনুপস্থিত দেখতে পান। এ বিষয়ে উপস্থিত চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে কেউ সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি। পরে ভারপ্রাপ্ত পরিসংখ্যানবিদ পরিচয়ে মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক জানান, ওই কর্মকর্তা ছুটিতে রয়েছেন।
এ সময় মন্ত্রী ছুটির আবেদনপত্র দেখতে চাইলে স্ক্যান করা একটি কপি দেখানো হয়। তাতে জেলা সিভিল সার্জনের অনুমোদন ছিল না। এরপর মন্ত্রী চিকিৎসকদের হাজিরা খাতা নিয়ে কনফারেন্স কক্ষে বসেন এবং সবার উপস্থিতি যাচাই করেন। সেখানে চারজন চিকিৎসককে অনুপস্থিত পাওয়া যায়, যাঁদের কারও ছুটির আবেদন পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যে মন্ত্রীর আকস্মিক আগমনের খবর পেয়ে কয়েকজন চিকিৎসক সাড়ে ১০টার দিকে তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে উপস্থিত হন। দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তাঁরা বিভিন্ন অজুহাত তুলে ধরেন। পরে তাঁদের কয়েকজন মন্ত্রীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
একপর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজওয়ানা রশিদও হাসপাতালে এসে পৌঁছান। মন্ত্রী তাঁর কাছে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা জানান, তিনি অসুস্থ এবং ছুটিতে রয়েছেন বলে দাবি করেন। তবে ছুটির অনুমোদিত আবেদনপত্র দেখতে চাইলে কেবল আবেদনের একটি কপি দেখাতে পারেন। যাতে সিভিল সার্জনের অনুমোদন ছিল না। এ ছাড়া অসুস্থতার কথা বললেও আবেদনে উল্লেখ ছিল পারিবারিক সমস্যার কারণে ছুটিতে থাকার বিষয়। পরে মন্ত্রীর কাছে বিশেষভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন রেজওয়ানা।
পরিদর্শনের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের চিকিৎসা ও সেবার খোঁজখবর নেন। এ সময় ওয়ার্ডগুলোর ওয়াশরুমে কোনো হ্যান্ডওয়াশ বা সাবান না পেয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বাজেট থাকা সত্ত্বেও কেন এসব ব্যবস্থা রাখা হয়নি, এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের ভুল স্বীকার করেন।
এ ছাড়া বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গেও কথা বলেন মন্ত্রী। রোগীরা চিকিৎসাসেবার নানা সমস্যা ও অভিযোগ তুলে ধরেন। মন্ত্রী সেসব অভিযোগ নোট করে নেন। একই সঙ্গে হাসপাতালের কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়াও শোনেন এবং তা লিখে রাখেন। একপর্যায়ে হাসপাতালের ফার্মেসিও ঘুরে দেখেন তিনি। সবশেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং হাসপাতালের সমস্যা ও অভিযোগগুলো নোট করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আগাম জানিয়ে পরিদর্শন করা হবে না। হঠাৎ করেই ঝটিকা সফর করা হবে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, যাঁরা হাসপাতালে চাকরি করবেন, তাঁদের কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না। সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। ঢাকায় বসবাস করে মফস্সলের হাসপাতালে চাকরি করার সুযোগ আর থাকবে না। প্রয়োজনে কর্মস্থলের কাছাকাছি থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।