আবদুস সালাম
আবদুস সালাম

আবদুস সালাম গ্রন্থাগার

পাঠাগারে নেই পাঠক, জাদুঘরে নেই কোনো স্মৃতিস্মারক 

ফেনীর সিলোনিয়া নদী। নদীটির শাখাখালে তীব্র হয়েছে ভাঙন। পাশেই ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। স্থানীয় লোকজনের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে জাদুঘর ভবনটি ভাঙনের কবলে পড়বে।

শুধু তা–ই নয়, স্থানীয় লোকজন বলছেন, গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটিতে নেই আবদুস সালামের কোনো স্মৃতিস্মারক। আকর্ষণের কিছু নেই বলে দিন দিন কমছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই জাদুঘরটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ে। বছরের অন্য সময় কাটে অবহেলায়।

গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটির অবস্থান দাগনভূঞা উপজেলায়। এ উপজেলায় আবদুস সালামের বাড়ি। তাঁর নামে ১৮ বছর আগে গ্রামের নাম সালামনগর করা হয়। তখনই নির্মাণ করা হয় গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটি। এর পাশেই রয়েছে শহীদ মিনার ও ভাষাশহীদ আবদুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

আবদুস সালামের জন্ম ১৯২৫ সালে। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা বইয়ের তথ্য বলছে, চাকরির সন্ধানে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন আবদুস সালাম। কাজ পেয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগে। নীলক্ষেতে সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি। সে বছরের ৭ এপ্রিল হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। 

ফেনীর ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে বই পড়ছেন এক পাঠক। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে

সপ্তাহে দু–একজন পাঠক–দর্শনার্থী

২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতির মুখে পড়েছিল গ্রন্থাগারটি। গত বৃহস্পতিবার সকালে গ্রন্থাগারটি ঘুরে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত কাঠের বুকশেলফগুলো সরিয়ে স্টিলের শেলফ বসানো হয়েছে। বসেছে প্লাস্টিকের নতুন চেয়ার ও টেবিল। বন্যায় নষ্ট হওয়া বইগুলো সরিয়ে নতুন বই আনা হয়েছে। তিন হাজারের মতো বই রয়েছে এই গ্রন্থাগারে। নিরাপত্তার জন্য আছে সিসিটিভি ক্যামেরাও।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে ফেনী জেলা পরিষদ থেকে মাস্টাররোলে একজন গ্রন্থাগারিক ও একজন তত্ত্ববধায়ক দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রন্থাগারিক মো. লুৎফুর রহমান বাবলু প্রথম আলোকে বলেন, পাঠক খুব একটা নেই। আশপাশের এলাকা থেকে সপ্তাহে দু-একজনের বেশি পাঠক বা দর্শনার্থী আসেন না।

পাঠক–দর্শনার্থী কেন আসেন না, এর একটা কারণ জানালেন জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়ক হয়ে জাদুঘরে আসার রাস্তাটি কয়েক বছর আগে সংস্কার করা হয়েছে। তবে জাদুঘরটি অনেক দূরে হওয়ায় কেউ আসতে আগ্রহী হন না।

দেখার কিছু নেই

গ্রন্থাগারটি নিয়ে কথা বলছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক হাসান। তাঁর ভাষ্য, গ্রন্থাগারে আবদুস সালামের নামে প্রকাশিত কোনো বই নেই। সালাম যে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন, সেই পদক, ক্রেস্ট কিছুই নেই। কিছু দেখার নেই বলে দর্শনার্থীও নেই। আলমগীর হোসেন নামের আরেকজন বলেন, ফেব্রুয়ারি এলেই সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিকেরা আসেন। এরপর আর কেউ খবর নেন না।

পাঠক কম হওয়ার জন্য মানুষের পাঠাভ্যাস কমে যাওয়াকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রমেন শর্মা। তিনি বলেন, ‘পাঠকেরা যখন বইমুখী হবেন, তখন এ গ্রন্থাগারগুলো সক্রিয় হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু কর্মসূচি নিলেও, দীর্ঘ মেয়াদে পাঠক তৈরি না করা গেলে আপনারা (সাংবাদিকেরা) যে জিনিসটি চাইছেন, সেটি সম্ভব হবে না।’

ভাঙন রোধে ব্যবস্থা

সিলোনিয়া নদীর শাখাখালে ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে এতে কাজ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছিল দাগনভূঞার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

এবারের কর্মসূচি

গ্রন্থাগার ও জাদুঘর ভবনের পাশে যে শহীদ মিনার রয়েছে, সেটিও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। বিভিন্ন জায়গায় দেখা দিয়েছে ফাটল। বেদির একাধিক টাইলস ভাঙা। প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানেই একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্তুতি দেখা গেছে। ইউএনও বলেন, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পাশাপাশি আলোচনা সভা হবে। এবারও একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে আবদুস সালামের পরিবারের পক্ষ থেকে সালামনগরের শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসন আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেবেন সালামের পরিবারের সদস্যরা।