
খুলনার তরমুজের খ্যাতি দেশজুড়ে। উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় উৎপাদিত এই ফল একসময় জেলার কৃষকদের জন্য লাভজনক ছিল। কিন্তু টানা কয়েক বছরের লোকসানে এবার অঞ্চলটিতে তরমুজ আবাদে বড় ধস নেমেছে। অনেক কৃষক ঝুঁকি এড়াতে চাষ কমিয়েছেন, কেউ কেউ একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন।
কৃষকদের মতে, উৎপাদনের ঝুঁকি, বাজারদরে অস্থিরতা, সেচসংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মিলিয়ে তরমুজের চাষে এখন লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি। একসময় যে তরমুজ উপকূলের অর্থনীতিতে গতি এনেছিল, সেটিই এখন অনেকের কাছে অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত মৌসুমে খুলনায় ১৭ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছিল। উৎপাদিত তরমুজের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। চলতি মৌসুমে আবাদ কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৯৩০ হেক্টরে। অর্থাৎ ১ বছরে ৪ হাজার ৩৬১ হেক্টর জমিতে চাষ কমেছে, কমার পরিমাণ ২৫ শতাংশের বেশি।
খুলনা উপকূলে তরমুজের উত্থান
খুলনার উপকূলীয় উপজেলাগুলো একসময় লবণপানির চিংড়িঘেরের জন্য পরিচিত ছিল। ঘূর্ণিঝড়-উপদ্রুত এসব এলাকায় সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে লবণপানির চিংড়ি চাষ কমে আসে। লবণের প্রভাব কাটিয়ে জমিতে ফেরে সবুজ ফসল। এক ফসলি আমন ধানের জমিতে তরমুজ হয়ে ওঠে কৃষকের নতুন ভরসা। অল্প সময়ে বিনিয়োগের দ্বিগুণ–তিন গুণ লাভের আশায় দিন দিন চাষ বাড়তে থাকে।
দাকোপের কাঁকড়াবুনিয়া গ্রামের কৃষক নিক্সন মণ্ডল বলেন, তরমুজের টাকা দিয়েই এলাকার অনেক মানুষের ভাগ্য ফিরেছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এটা জুয়ার মতো হয়ে গেছে। বীজ পোঁতা থেকে বিক্রি পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কখনো বীজ ফোটে না, কখনো ভাইরাস বা পোকার আক্রমণ, কখনো পানির সংকট, কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে দাম কমে যাওয়ার ভয় তো আছেই।
চালনা মহিলা কলেজের শিক্ষক জয়তীশ রঞ্জন মণ্ডল বলেন, তরমুজের মতো এত অস্থির বাজার আর কিছুর নেই। দুর্বল বিপণনব্যবস্থা আর মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এই ফসল দিয়েই এলাকার অর্থনীতি বদলে দেওয়া সম্ভব ছিল।
খুলনায় সবচেয়ে বেশি তরমুজের চাষ হয় দাকোপে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘বাজুয়ার তরমুজ’ নামে পরিচিত এই সুমিষ্ট ফল। জেলার মোট উৎপাদনের ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ আসে এই উপজেলা থেকে। এলাকাটির চার হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি তরমুজ চাষের সঙ্গে যুক্ত।
গত বছর দাকোপে ৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮০০ হেক্টরে। সরেজমিনে পানখালী, তিলডাঙ্গা, কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের মাঠে দেখা গেছে, অনেক জমি ফাঁকা পড়ে আছে, কোথাও গবাদিপশু চরছে। বানীশান্তা, কৈলাশগঞ্জ, লাউডোব, দাকোপ সদর ও বাজুয়ার বিলেও চাষ কমেছে। মাঠে তরমুজের গাছ ছোট অবস্থায় আছে, পরিচর্যা চলছে; তবে মৌসুমের স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই অনুপস্থিত।
কালিকাবাটি গ্রামের কৃষক চিত্তরঞ্জন মণ্ডল বলেন, ‘গত বছর ২৭ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছিলাম, লাভ হয়নি। এ বছর ১০ বিঘা কমিয়েছি। সারের দাম, বীজের দাম—সবই বেড়েছে। মানুষ আগ্রহ হারাচ্ছে। যাঁদের সেচের সুবিধা আছে, তাঁরা কম ঝুঁকির বোরো ধান, রকমেলন, বাঙ্গি—এসবের দিকে ঝুঁকছেন।’
পশ্চিম খেজুরিয়া গ্রামের উৎপল রপ্তান গত বছর ৯ বিঘায় চাষ করলেও এবার করেছেন ৪ বিঘায়। তাঁর ভাষ্য, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা সেচ। দেখা যায়, মুহূর্তে পানির প্রয়োজন, সেই সময় খাল-বিল শুকনা। চলতি বছর এরই মধ্যে পানির সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতিবছর লোকসান হওয়ায় এই বছর সবাই চাষ কমিয়ে ফেলেছেন।’
দাকোপের পর সবচেয়ে বেশি তরমুজ হয় কয়রা, বটিয়াঘাটা ও পাইকগাছায়। গত বছর কয়রায় ৪ হাজার ৫০ হেক্টর ও পাইকগাছায় ২ হাজার ১৪০ হেক্টরে আবাদ হয়েছিল। এবার তা কমে যথাক্রমে ২ হাজার ৬০০ ও ১ হাজার ৫০ হেক্টরে নেমেছে।
পাইকগাছার কুমখালী গ্রামের শান্ত মণ্ডল গত মৌসুমে ২৫ বিঘায় তরমুজ চাষ করেছিলেন। লোকসানের কারণে এবার একটুকরা জমিতেও লাগাননি। তিনি আরও বলেন, তরমুজের উৎপাদন হয় অনেক, কিন্তু বিক্রি করা খুব কঠিন। বারবার লোকসান দিয়ে টিকে থাকা যায় না।
কী বলছে কৃষি বিভাগ
দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রমজানকে সামনে রেখে অনেকেই তরমুজ চাষ করেন। এবার সেই বাজার ধরা যাবে না। গত বছর ভালো ফলন হলেও অনেক কৃষক বিক্রি করতে পারেননি। ফসল তোলার সময় বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে। তাই অনেকে ঝুঁকি নেননি।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর অনেক কৃষকের উৎপাদন খরচই ওঠেনি। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হলে দাম পড়ে যায়। খুলনায় তরমুজ কিছুটা দেরিতে ওঠে। পটুয়াখালীর চাষিরা আগে বাজার ধরেন। আমাদের তরমুজ বাজারে আসার সময় কখনো চাহিদা থাকে, কখনো থাকে না—এই অনিশ্চয়তায় কৃষক নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।’