
প্রধান সমস্যা জনবল সংকট
চিকিৎসকের পদ আছে ৩৫টি
বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৭ জন
বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নেন ৪০০-৫০০ জন
হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন ৩০-৩৫ জন
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটে প্রায় আড়াই বছর ধরে বন্ধ আছে প্রসূতিসহ সব ধরনের বড় অস্ত্রোপচার। প্রায় এক বছর আট মাস ধরে বন্ধ এক্স-রে সেবা। আলট্রাসনোগ্রাফি হচ্ছে না এক মাস। সরকারি হাসপাতালে এসব সেবা না পেয়ে বাড়তি টাকা খরচ করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে রোগীদের।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ বলছে, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শূন্য পদে লোক নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগ না হওয়ায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাজন কুমার দাস জানান, হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে বহির্বিভাগে ৪০০ থেকে ৫০০ জন চিকিৎসা নেন। ভর্তি থাকেন ৩০ থেকে ৩৫ জন।
৩৫ পদের ১৬টিই শূন্য
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ শয্যার এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পদ আছে ৩৫টি। শূন্য আছে ১৬টি পদ। এ ছাড়া দুজন চিকিৎসক প্রেষণে অন্য হাসপাতালে কর্মরত আছেন। সে হিসাবে বর্তমানে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক আছেন ১৭ জন।
৩১ শয্যার এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পদ আছে ৩৫টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৭ জন।
জুনিয়র কনসালট্যান্ট (প্রসূতি ) পদটি প্রায় আড়াই বছর ধরে শূন্য। এ পদে কর্মরত তাসলিমা আফরোজ ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল প্রেষণে ঢাকার একটি হাসপাতালে বদলি হয়ে যান। জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) পদটিও প্রায় আড়াই বছর ধরে খালি। সর্বশেষ এ পদে কর্মরত মো. ইফতেখার শামীম ২০২৪ সালের ১৯ মে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। এ ছাড়া জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) পদটি তিন বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য। এই পদগুলোতে চিকিৎসকের অভাবে প্রায় আড়াই বছর ধরে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতিসহ সব ধরনের বড় অস্ত্রোপচার বন্ধ আছে।
গতকাল সোমবার সকালে উপজেলার ভূইয়াকান্দি গ্রাম থেকে জ্বর নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন এক গৃহবধূ। তিনি এক মাস আগেও প্রসূতি অস্ত্রোপচারের জন্য এখানে এসেছিলেন। তবে চিকিৎসক না থাকায় অস্ত্রোপচার করাতে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই নারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরে ১৫ হাজার টেয়া খরচা কইরা বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশনে বাচ্চা অইছে আমার। ভোগান্তিও অনেক অইছে। সরকারি হাসপাতাল থাইকাও প্রাইভেট ক্লিনিকে যাইতে অয়। এমন হাসপাতাল না থাকলেই কী?’
রোগী সামাল দিতে হিমশিম
গতকাল সকাল ১০টার দিকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, অস্ত্রোপচার, এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি কক্ষগুলো তালাবদ্ধ। বহির্বিভাগে রোগীদের ভিড়। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি। কর্মরত চিকিৎসকেরা রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রত্যাশিত সেবা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকজন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুজন কর্মচারী জানান, প্রায় প্রতিদিনই প্রসূতিরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের জন্য এসে ফিরে যান। চিকিৎসকের অভাবে মাসে ৫০ থেকে ৬০ জন প্রসূতি সরকারি খরচে অস্ত্রোপচারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বন্ধ এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) পদটি প্রায় এক বছর আট মাস ধরে শূন্য। সর্বশেষ এ পদে কর্মরত ব্যক্তি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বদলি হন। এর পর থেকে এক্স-রে সেবা বন্ধ। অন্যদিকে প্রায় এক মাস ধরে আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন নষ্ট থাকায় এ সেবাও বন্ধ আছে।
উপজেলার ফতেপুর গ্রামের অদুদ মিয়া গতকাল সকালে হাতের এক্স-রে করাতে এসে হাসপাতাল থেকে ফিরে যাচ্ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অপারেটর না থাকায় এক্স-রে করাতে পারেননি। বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে এক্স-রে করাতে হবে। এতে বাড়তি টাকা খরচ হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাজন কুমার দাসও দীর্ঘদিন ধরে এসব সেবা বন্ধ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটে সেবা ও চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শূন্য পদে লোক নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েছেন; কিন্তু লোক নিয়োগ হচ্ছে না।