জমিতে সেচের জন্য ডিজেল কিনতে এসে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন কৃষক রফিকুল ইসলাম। আজ শনিবার দুপুরে নড়াইল সদর উপজেলার মাছিমদিয়া এলাকার সরদার ফিলিং স্টেশনের সামনে
জমিতে সেচের জন্য ডিজেল কিনতে এসে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন কৃষক রফিকুল ইসলাম। আজ শনিবার দুপুরে নড়াইল সদর উপজেলার মাছিমদিয়া এলাকার সরদার ফিলিং স্টেশনের সামনে

‘গাড়িআলারা তেল পাচ্ছে, আমরা কৃষকেরা পাচ্ছিনে’

‘এলাকায় যে কয়ডা দুকান, সবই বন্ধ। শহরে আইসেও কোথাও কোনো ব্যবস্থা করতি পারিনি। এই যে দেহেন, ড্রাম খালি, বাড়ির দিকি রওনা হইছি। আমার নিজের ধানও যাচ্ছে (নষ্ট হচ্ছে), অন্যদেরও যাচ্ছে। গাড়িআলারা তেল পাচ্ছে, আমরা কৃষকেরা পাচ্ছিনে। আমাগের জন্যি কি কোনো বাজেট নেই? আমরা তো আর তেল নিয়ে নষ্ট করিনে।’

আজ শনিবার দুপুরে নড়াইল সদর উপজেলার মাছিমদিয়া এলাকার সরদার ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে হতাশা ও আক্ষেপ নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সদর উপজেলার পলইডাঙ্গা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম। বোরো ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য নিজ এলাকায় ডিজেল না পেয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে শহরে এসেছেন সকালে। দুপুর পর্যন্ত এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছেন। কোথাও এক লিটার তেলও পাননি। হতাশ হয়ে শূন্য ড্রাম নিয়েই বাড়ি ফিরছেন। সেচ নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা।

নড়াইলে রফিকুল ইসলামের মতো অনেক কৃষক ডিজেলের খোঁজে এক দোকান থেকে আরেক দোকান, এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছেন। কোথাও মিলছে না ডিজেল। বোরো ধানের চাষ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা।

রমজান আলী নামে এক কৃষক বলেন, ‘এখন বোরোর ভরা মৌসুম চলতিছে। আমি কুড়ি কিলোমিটার দূর থেকে সাথে করে ড্রাম নিয়ে আইছি ডিজেল নিতে। তিনটে পাম্পে গেছি, তিনটেই বন্ধ, ডিজেল নেই। কীভাবে কৃষকরা ধানে পানি দেবে?’

আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নড়াইল জেলা শহর ও আশপাশে থাকা পাঁচটি তেলের পাম্প ঘুরে দেখা যায়, একটি পাম্পে শুধু পেট্রল পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে রেশনিং পদ্ধতিতে স্বল্প পরিমাণে তেল নিচ্ছেন মোটরসাইকেল চালকেরা। বাকি চারটি পাম্পে রশিতে লাল কাপড় বাঁধা হয়েছে—যা তেল সংকটের সংকেত দিচ্ছে। এসব পাম্পে ডিজেল, পেট্রল বা অকটেন কোনোটিই নেই। পাম্পগুলোয় সেচের জন্য তেল নিতে আসা কৃষক ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা এসে ফিরে যাচ্ছেন। ক্রেতাদের অভিযোগ, তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার খুচরা দোকানে বাড়তি দাম দিলে তেল পাওয়া যাচ্ছে।

নড়াইল-মাগুরা আঞ্চলিক সড়কে বাস চালান রিপন শেখ। তিনি বলেন, ‘তেলের অভাবে তিন-চার দিন গাড়ি বন্ধ। সামনে ঈদ, এখন যদি গাড়ি চালাতে না পারি, আমরা কোনোভাবে চলব?’

যানবাহন প্রবেশ বন্ধ করে জ্বালানি তেল না থাকার সংকেত দিয়ে রশির সঙ্গে লাল কাপড় বাঁধা হয়েছে। আজ শনিবার দুপুরে নড়াইল শহরের একটি ফিলিং স্টেশনে

তেল কিনতে আসা এক ক্রেতা বলেন, ‘সরকার বলতিছে, তেলের কোনো সংকট নেই। তালি পাম্প সব কটি বন্ধ হবে কেন? কিছু কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তেল মজুত রেখে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করেছে, যার কারণে ডিজেলের ঘাটতি হচ্ছে। আবার বেশি টাকা দিলে ঠিকই তেল পাওয়া যাচ্ছে।’

পিকআপ চালক জাকির হোসেন বলেন, ‘পাম্পে গিলি তেল পাওয়া যাচ্ছে না, দোকানে গিলি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় বেশি টাকা দিলি তেল পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিজিই কিনিছি। টাকা বাড়ায় দিলি এই তেল কোথা থেকে আসতিছে?’

তবে জ্বালানি তেল মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাম্পসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, চাহিদার তুলনায় কম তেল আসা ও ক্রেতাদের বাড়তি চাপ থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ডিপো থেকে তেল আসার পর যতক্ষণ মজুত থাকে, ততক্ষণই ক্রেতাদের দেওয়া হচ্ছে।

সরদার ফিলিং স্টেশনের কর্মী সাকিব হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল কিছুই নেই। আর তেলের দাম বাড়ানোর কোনো বিষয় নেই। আসলে তেল ডিপো থেকেই দিচ্ছে না। বৃহস্পতিবার আমরা ডিজেল আর অকটেন পাইছি ডিপো থেকে, পেট্রল পাইনি।’

পাশের পিষণ ফিলিং স্টেশনের কর্মী আরাফাত আলী বলেন, ‘গতকাল শুক্রবার থাকায় ডিপো থেকে তেল আসেনি। তেল ফুরিয়ে যাওয়া এক ঘণ্টার মতো হলো, আমরা পাম্প বন্ধ করে দিয়েছি। এ ছাড়া বেশি টাকা দিলে তেল পাওয়ার কোনো ঘটনা নেই। এটা বাইরের দোকানগুলোতে হতে পারে। আর আমাদের এখানে বড় কর্মকর্তারা এসে দেখে গেছে, কোনো মজুত পায়নি।’

ক্রেতাদের বিভিন্ন অভিযোগ ও সে বিষয়ে প্রশাসনের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল ছালাম। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।