
কাজল কুমার দাস মাটির শোপিসে নকশা করার কাজ শিখতে গিয়েছিলেন ভারতের কৃষ্ণনগরে। বাড়ি ফেরার পয়সা ছিল না। দেশে ফিরতে গায়ের জামাটা বিক্রি করতে হয়েছিল। নিজের জীবনটাও ঠিক সে রকমই। তাঁর হাতের তৈরি পণ্য শোরুমে বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। একই জিনিস তিনি ফুটপাতে নিয়ে বসে আছেন। বিক্রি করতে হচ্ছে সস্তায়।
কাজল দাসের (৬৫) বাড়ি রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া মহল্লায়। প্রতিদিন সকাল ১০টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনের সামনে সাদা কাপড় বিছিয়ে মাটির তৈরি শিল্পপণ্য সাজিয়ে বসেন তিনি। সরেজমিনে দেখা গেল, কাপড়ের ওপর সারি সারি ছোট ছোট শিল্পকর্ম সাজানো। কোথাও গরুর গাড়ি, কোথাও ফুলের নকশা, আবার কোথাও সূক্ষ্ম খোদাই করা বিভিন্ন হরফের নকশা। পাশেই টুল পেতে বসেছেন কাজল।
বেচাকেনার ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় কাজল দাসের সঙ্গে। তাঁর তৈরি পণ্য বিক্রি হয় বড় ব্র্যান্ডের শোরুমে। কিন্তু সেই বিক্রির পেছনে রয়েছে জটিল প্রক্রিয়া। ঢাকায় পণ্য পৌঁছাতে পিকআপ ভাড়া লাগে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এক দিন আগে গিয়ে পণ্য জমা দিতে হয়, পরদিন হয় কোয়ালিটি চেক, তারপর স্টোরে জমা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সময়, শ্রম, খরচ—সবই শিল্পীর।
কাজল দাস বলেন, শোরুমগুলোর কথা হচ্ছে, ‘আমরা কোনো বাকি নিই না, নগদ পয়সায় কাজ করি তাই যেভাবে বলব সেভাবেই কাজ করতে হবে’—এই পুরো ব্যবস্থায় তাঁর হাত খুব কমই থাকে। এমনকি শোরুমে জিনিসপত্র একেকটা চেক করিয়ে দেখিয়ে আসার পরও জিনিসপত্র ভাঙলে সেটার দায়ভার বহন করতে হয় কাজলকেই। তিনি বলেন, ‘১০টা পণ্য ভেঙে গেলে ওই ১০টা আমাদেরই কম্প্রোমাইজ করতে হয়। কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। পণ্যে শোরুমের লোগো থাকলে সেটি বাইরে বিক্রি করা যায় না। ফলে সেই পণ্য পড়ে থাকে।’
প্যাকেজিং, পরিবহন, এমনকি কোন বক্সে কত পণ্য যাবে—সব নির্ধারিত থাকে শোরুমের। কারিগর শুধু তৈরি করেন। কিন্তু নিজের তৈরি পণ্য নিজের মতো করে বিক্রি করার স্বাধীনতা তাঁর নেই। এই পণ্যই বাইরে বিক্রি করলে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। ‘এই আইটেমটা আমি বানাইছি, কিন্তু বাইরে দিলে কেস করে দেবে’—বললেন কাজল দাস। এ ছাড়া সব মাসে সমান অর্ডার পান না। এমনও সময় গেছে, চার মাস কোনো অর্ডারই পাননি। চাহিদা অনুযায়ী শোরুম থেকে অর্ডার পাঠায়।
অর্ডার কমে গেলে জরিমানা, এমনকি স্টোরে ভেঙে গেলেও সেই ক্ষতিটা বহন করতে হয় কারিগরকে। এত কিছুর পরও কেন এই কাজ? কাজল দাসের উত্তর সহজ—এটাই তাঁর জীবন। ছেলে অমিতকেও শিখিয়েছেন এই কাজ।
নগরের সাগরপাড়া মোড়ের বটতলার ডান দিকে সরু একটি গলি। সেই গলির মাথায় ছোট্ট একটি বাড়ি—বাইরে থেকে খুব সাধারণ। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই যেন শিল্পকর্মের অন্য এক জগৎ। গেট পেরিয়েই চোখে পড়ে বিবর্ণ রঙের একটি মাটির চুল্লি। এখানেই পোড়ানো হয় একের পর এক মাটির শিল্পপণ্য। চুল্লির ওপরে পড়ে আছে নষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু ডাইস, জিনিসপত্র।
ভেতরে ঢুকতেই বারান্দায় একটি টুল এগিয়ে দেন কাজল কুমার দাস। বসতে না বসতেই শুরু করেন গল্প। পুরো বারান্দার চারপাশেই সারি সারি সাজানো মাটির শোপিস—কিছু নিখুঁত, কিছু পোড়াতে গিয়ে ভেঙে যাওয়া, আবার কিছু শোরুম থেকে ফেরত আসা। কাজল দাস বললেন, ‘একসময় এই ব্যবসা জমজমাট চলত। সেই টাকা দিয়েই এই বাড়িটা করেছি। এখন কোনোমতে সংসার চলে।’
কাজল দাসের গল্পটা কোনো প্রথাগত কুমার পরিবারের গল্প নয়। তিনি এই কাজের ‘ফার্স্ট জেনারেশন’। ছোটবেলায় কুষ্টিয়ায় প্রতিমা বানানো দেখেই আগ্রহ জন্মায়। কিন্তু শেখানোর মতো কেউ ছিল না। রাতের অন্ধকারে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর টেবিলের নিচে মোমের আলো জ্বেলে নিজের মতো করে মাটি কেটে ছোট ছোট ভাস্কর্য বানাতেন।
কাজল বললেন, ‘আমার জীবনের প্রথম কাজ ছিল রবি ঠাকুর। তারপর লালন শাহ, কৃষকের ধান কাটার দৃশ্য—সবই বানিয়েছি একেবারে হাতে, কোনো ছাঁচ ছাড়াই।’ কিন্তু সেই কাজগুলো টেকেনি। পোড়ানোর সঠিক পদ্ধতি না জানায় একসময় সব ভেঙে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘পোড়ালাম ঠিকই। কিন্তু তারপর ভেঙে কত খণ্ড যে হলো আমি নিজেও বলতে পারব না।’
সেই ব্যর্থতাই তাঁকে ঠেলে দেয় শেখার পথে। শেষমেশ পাড়ি জমান ভারতের কৃষ্ণনগরে। সেখানে ৮ থেকে ৯ মাস কাজ করে শিখে নেন ছাঁচ (ডাইস) তৈরি আর পোড়ানোর কৌশল। যদিও বিনিময়ে শুধু খাবার পান, কোনো টাকা নয়। দেশে ফেরার সময় হাতে কোনো টাকা ছিল না। বাধ্য হয়ে জাপানি কাপড়ের তৈরি পছন্দের জামা দুটি বিক্রি করে দেশে ফিরে আসেন। ‘জামা দুটি খুব ভালো ছিল’ বলতে গিয়েই গলা ধরে আসে তাঁর।
একেকটি পণ্য তৈরিতে খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ টাকা। এক কেজি প্লাস্টারের দাম ৭০ টাকা। একটি ডাইস বানাতে লাগে প্রায় ২ কেজি প্লাস্টার—মানে ১৪০ টাকা। এই একটি ডাইস থেকে সর্বোচ্চ ২০০টি পণ্য তৈরি করা যায়। তারপর সেটি ক্ষয়ে যায়, আবার নতুন করে বানাতে হয়। মাটি ছেঁকে, ছাঁচে চাপ দিয়ে, ফিনিশিং করে, ফ্যানের নিচে শুকিয়ে, তারপর ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা ধরে পোড়ানো। পুরো প্রক্রিয়াটি শ্রমসাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। একটু ভুল হলেই ফেটে যায়। ফেটে গেলে সেই ক্ষতি কারিগরেরই।
এই বাড়িতেই থাকেন তাঁর অসুস্থ স্ত্রী, ছেলে অমিত, ছেলের স্ত্রী ও নাতি সুদীপ্ত। ঘরের প্রতিটি কোণেই মাটির জিনিসপত্র। তবু কোথাও অগোছালো নয়, ধুলাও যেন জায়গা পায় না। যত্নের ছাপ স্পষ্ট।
কথা বলার ফাঁকে ছেলের বউ এসে যোগ দেন। সংসারের পাশাপাশি তিনিই এখন কাজের বড় অংশ সামলান। তিনি বললেন, ‘এই কাজ লোক দিয়ে করানো যায় না। এখন লোকও পাওয়া যায় না। তাই নিজেরাই খাটি।’
পাশের ঘরে বসে আছেন কাজল দাসের স্ত্রী। ২০২২ সালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে চলাফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সংসারের ভার পুরোটাই এখন অমিতের বউই সামলান। খুব আগ্রহের সঙ্গে তিনি ঠাকুরঘর দেখাতে নিয়ে গেলেন। সেখানে সুন্দরভাবে সাজানো প্রতিমা, পূজার সামগ্রী। ঠিক পাশেই চোখে পড়ে খোদাই করা আরবি হরফের নকশা—যেগুলো মূলত মুসলিম ক্রেতাদের জন্য তৈরি।
ছেলে অমিত নিজের ঘরে বসে হাতে টিপে টিপে বানাচ্ছেন প্রদীপ। বাড়ির প্রতিটি ঘরেই ছড়িয়ে আছে মাটির কাজ। কাজল দাস জানান, এই মাটির কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ তিনি জানেন না, কখনো করেনও নি। নিজস্ব বাড়ি না থাকলে এই কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভবই হতো না। ভাড়া বাসায় এই মাটি, এই চুল্লি, এই আগুন—সবই অসম্ভব।
একটা অনলাইন দোকান, যেখানে অন্তত নিজের পরিশ্রমের দামটা নিজেই ঠিক করতে পারবেন। সেই আশায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘handicrafts home’ নামে একটা পেজ খুলেছেন। কিন্তু খুব বেশি সাড়া নেই সেখানে। শোরুমের আলোয় সাজানো মাটির প্রতিটি পণ্যের পেছনে যে হাতগুলো থাকে, তাদের গল্প খুব কমই সামনে আসে। কাজল দাসদের মতো কারিগরেরা তাই আজও নিঃশব্দে তৈরি করে চলেছেন শিল্প। কিন্তু সেই শিল্পের প্রকৃত মূল্য, স্বীকৃতি আর ন্যায্যতা এখনো রয়ে গেছে প্রশ্নের মুখে।