
‘নীল নবঘন আষাঢ়গগনে/ তিল ঠাঁই আর নাহি রে।/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে’—কবিগুরুর এই কবিতার ‘নীল’ শব্দটি থেকেই ধরে নেওয়া হয়েছে আষাঢ়ের রং নীল। তাই পয়লা আষাঢ় রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা নীল ফিতায় যেন আষাঢ়স্যের প্রথম দিবসকে বেঁধে ফেললেন। তাঁরা সবার হাতে বেঁধে নিলেন নীল ফিতা। গাইলেন আষাঢ়ের গান; আর খেলেন আষাঢ় মাসে পাকা আম।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে বেলা ১১টার দিকে কলেজের অধ্যক্ষ শিখা সরকারের হাতে যখন নীল ফিতা বাঁধা হয়, তখন পর্যন্ত আষাঢ়ের আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও ছিল না; বরং আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরে পড়ছিল। আকাশের এই রুদ্রমূর্তি অবশ্য শেষ পর্যন্ত থাকেনি। বিকেলে কালিমাখা মেঘে আঁধার ঘনিয়ে আসে। বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ সবার চোখেমুখে যেন আষাঢ়ের আনন্দ মেখে দিল।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সায়েইদুর রহমানের উদ্যোগে কলেজে আষাঢ়ের প্রথম দিবস পালনের আয়োজন করা হয়। রবি ঠাকুরের ‘আষাঢ়’ কবিতার প্রথম শব্দ নীলকে বর্ষার রং ধরে নিয়ে আগের দিনই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল মেয়েরা নীল শাড়ি পরে আসবেন; আর ছেলেরা নীল জামা পরে আসবেন। তবে তাৎক্ষণিক নীল শাড়ি ও নীল জামা জোগাড় না থাকায়, অনেকেই ওই রঙের পোশাক পরে আসতে পারেননি। তাতেও আয়োজনে কোনো ছেদ পড়েনি। উপস্থিত সবার হাতে বেঁধে দেওয়া হয় নীল ফিতা।
অনুষ্ঠানে নীল শাড়ি পরে এসেছিলেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ঐশী সাহা। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে। কলেজ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। ঐশী রাজশাহী শহরে একটি ছাত্রীনিবাসে থেকে পড়াশোনা করেন। তাঁর নিজের নীল শাড়ি ছিল না; কিন্তু অনুষ্ঠানে নীল শাড়ি পরতে হবে, এ কথা শুনে মনে পড়ে তাঁর মায়ের নীল শাড়ি আছে।
ঐশী জানান, মাকে ফোন করে বলে দিয়েছিলেন, ‘তোমার নীল শাড়িটা বাসের কন্ডাক্টরের মাধ্যমে পাঠিয়ে দাও।’ মা সেই অনুযায়ী বাসের কন্ডাক্টরের হাতে শাড়িটা দেন। তিনি নগরের সিরোইল বাস টার্মিনাল থেকে সকালে গিয়ে শাড়ি নিয়ে আসেন। সেই শাড়ি পরে তিনি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন।
ঐশী বলেন, ‘সাইদুর রহমান স্যার বরাবরই এ রকম আনন্দঘন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। অনুষ্ঠানটি ছিল একেবারে হৃদয়ছোঁয়া। ঋতুবৈচিত্রে৵র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই আয়োজন আজ আমার মন ভালো করে দিয়েছে। বন্ধুত্বের সঙ্গে একটা মিলনমেলা হয়েছে। আজকের দিনের স্মৃতিগুলো অনেক সুন্দর অনুভূতির জন্ম দিয়েছে, যা অনেক দিন মনে রাখার মতো।’
একই বর্ষের শিক্ষার্থী শ্রমণা সেনও নীল শাড়ি পরে এসেছিলেন। তাঁর বাড়ি নাটোরে। তিনি রাজশাহী শহরে ছয়জন মিলে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁরও শাড়ি কাছে ছিল না। অনুষ্ঠানে নীল শাড়ি পরতে হবে, এ কথা শুনে তিনিও মাকে নীল শাড়ি প্রস্তুত করে রাখতে বলেছিলেন; আর খুঁজছিলেন নাটোর থেকে আজ রাজশাহীতে কে আসেন!
কাকতালীয়ভাবে শ্রমণা জানতে পারেন, তাঁর পাশের কক্ষের দিদি প্রীতি বসাক নাটোরে রয়েছেন এবং আজকেই রাজশাহীতে আসবেন। তিনি ফোন করে শাড়িটা আনার জন্য অনুরোধ করেন। শ্রমণা সেন জানান, শাড়িটা হাতে পেয়ে যারপরনাই আনন্দ পেয়েছেন। অনুষ্ঠানে শ্রমণা সেন দুটি গান গেয়েছেন— ‘আজি ঝরো ঝরো বাদরদিনে’ ও ‘মন মোর মেঘেরও সঙ্গী,...’
শ্রমণা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন উপলক্ষে এ ধরনের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে; কিন্তু কলেজগুলোতে এ ধরনের আয়োজন হয় না। আমাদের বিভাগের সাইদুর স্যারই সেদিক দিয়ে উল্টো। তিনি শুধু উপলক্ষ খুঁজতে থাকেন। উপলক্ষ পেলেই একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান উপহার দেন। এ অনুষ্ঠানও খুবই মজার হয়েছে।’
কলেজের অধ্যক্ষ শিখা সরকার কথা বলতে উঠে রবীন্দ্রনাথের বর্ষার কবিতা পাঠ করে শোনান। ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ করিম বর্ণনা দেন, শীত পেরিয়ে কীভাবে মৌসুমি বাতাস বৃষ্টি নিয়ে আসে। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মতিউর রহমান কথা বলতে উঠে গান শুরু করে দেন, ‘চাতক বাঁচে কেমনে মেঘের বরিষণ বিনে’।
অধ্যাপক সাইয়েদুর রহমান বলেন, তাঁর বিভাগের সব বর্ষের শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি বন্ধন তৈরি করার জন্য তিনি মূলত এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। ধারাবাহিক পড়াশোনার ফাঁকে বর্ষাকে ঘিরে এক বেলার এই ছোট্ট আয়োজন একঘেয়েমি দূর করে ছাত্রীদের মনে প্রফুল্লতা বয়ে আনবে।