উদ্ধারের পর পাখিটির পায়ের জাল কেটে চিকিৎসা দিয়ে মনপুরা উপজেলার কালকিনি বনে অবমুক্ত করা হয়। গতকাল শুক্রবার তোলা
উদ্ধারের পর পাখিটির পায়ের জাল কেটে চিকিৎসা দিয়ে মনপুরা উপজেলার কালকিনি বনে অবমুক্ত করা হয়। গতকাল শুক্রবার তোলা

ভোলায় শিকারির জালে আটকা পড়া নিশিবক উদ্ধার করল পাখি শুমারি দল

ভোলায় শিকারির জাল থেকে একটি নিশিবক উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে অবমুক্ত করেছে জলচর পরিযায়ী পাখি শুমারিতে যাওয়া একটি দল। গতকাল শুক্রবার শুমারিকালে এ উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

পাখি পর্যবেক্ষক ও পর্বতারোহী এম এ মুহিত মুঠোফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শিকারির জালে আটকা পড়ে নিশিবকটি মারাত্মকভাবে ক্লান্ত ছিল। সময়মতো উদ্ধার না হলে সেটির মৃত্যু হতে পারত। শুমারি দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছালে জালে আটকে থাকা পাখিটি ছাড়া অন্য সব পাখি উড়ে যায়। পরে পাখিটির পায়ের জাল কেটে চিকিৎসা দিয়ে মনপুরা উপজেলার কালকিনি বনে অবমুক্ত করা হয়।

বাংলাদেশ বার্ডস ক্লাবের আয়োজনে ১১ জানুয়ারি থেকে ভোলার উপকূলে জলচর পরিযায়ী পাখির শুমারি শুরু হয়েছে। শুমারি দলের সদস্যরা ১০ জানুয়ারি ঢাকা থেকে লঞ্চযোগে ভোলায় পৌঁছান। পাখির বিচরণক্ষেত্র, পরিবেশগত পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে ৩৮ বছর ধরে ভোলার উপকূলে এই শুমারি কার্যক্রম চালিয়ে আসছে সংগঠনটি।

ভোলায় সবচেয়ে বেশি জলচর পরিযায়ী

শুমারি দলের সূত্র জানায়, ১৯৮৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ভোলার উপকূলে নিয়মিত জলচর পাখি শুমারি করা হচ্ছে। এবারের দলে বাংলাদেশ বার্ডস ক্লাবের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. ফয়সাল, সম্পাদক ও পাখি পর্যবেক্ষক এম এ মুহিত, পাখি–বিশেষজ্ঞ নাজিম উদ্দিন খান, রবিউল ইসলাম, বন বিভাগের কর্মকর্তা মিলাসহ আট থেকে নয়জন সদস্য আছেন।

জাঙ্গালিয়া নদী ও ভোলা খালের মোহনা থেকে শুমারি শুরু করে দলটির সদস্যরা তেঁতুলিয়া, ইলিশা, মেঘনা, মেঘনা-তেঁতুলিয়া সাগর মোহনা এবং বুড়া গৌরাঙ্গ নদী হয়ে আবার তেঁতুলিয়া নদী দিয়ে ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যার মধ্যে খেয়াঘাটে ফিরবেন। আট দিনের (১১-১৮ জানুয়ারি) এ শুমারি শেষে আগামীকাল রোববার রাতে দলটির ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।

পাখি–বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের মধ্যে ভোলায় সবচেয়ে বেশি জলচর পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে, যা মোট পরিযায়ী পাখির প্রায় ৬০ শতাংশ। এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বিপন্ন প্রজাতির পাখিও দেখা যায়।

৩৮ বছরে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে

নদী ও সাগর মোহনার কাঁদাচরে ট্রলার ও নৌকায় ঘুরে বাইনোকুলার ও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এসব জলচর পরিযায়ী পাখি গণনা করা হয়। এ বিষয়ে এম এ মুহিত বলেন, ব্লক মেথডে দূরবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করে একাধিক পর্যবেক্ষকের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। ঝাঁকবদ্ধ পাখির ক্ষেত্রে ধারণাভিত্তিক গণনা করতে হয়, যেখানে সামান্য তারতম্য থাকতে পারে।

শুমারির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে সায়েম ইউ চৌধুরী বলেন, পরিযায়ী পাখির সংখ্যা উপকূলীয় পরিবেশের স্বাস্থ্য নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ইস্ট এশিয়া-অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উড়ালপথে কোনো সমস্যা হলে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে।

পাখি–বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট চাপে গত ৩৮ বছরে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নদীতে নতুন চর জেগে উঠলেই চাষাবাদের জন্য দখল হয়ে যাচ্ছে, ফলে পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি চর ও নদীতে কারেন্ট জাল ও মশারি জাল দিয়ে মাছ শিকারের সময় পাখি শিকারও বাড়ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুতর হুমকি।