ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের পর রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটি করপোরেশন ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ড) আসনের বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির তিন প্রার্থীর মধ্যে লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গিয়েছিল।
কিন্তু গত ২৮ জানুয়ারি দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে জাতীয় পার্টির প্রার্থী লন্ডনপ্রবাসী মঞ্জুম আলীর প্রার্থিতা বাতিল করেন আপিল বিভাগ। এর পর থেকে এই আসনে পাঁচ প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনায় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মোকাররম হোসেন ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. রায়হান সিরাজী।
প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীই প্রতিদিন গণসংযোগ, মিছিল, পথসভাসহ ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। এ আসনে অন্য তিন প্রার্থী হলেন ইসলামী আন্দোলনের এ টি এম গোলাম মোস্তফা, বাসদের (মার্ক্সবাদী) আহসানুল আরেফিন ও ইসলামিক ফ্রন্টের মোহাম্মদ আনাস।
নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়লেও এই আসনে জয়-পরাজয়ে মঞ্জুম আলীর সমর্থকেরা ‘ফ্যাক্টর’ হবেন বলে মনে করছেন রংপুর-১ আসনের সাধারণ ভোটার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী। এই আসনের অন্তত ৩০ জন নারী ও পুরুষ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।
গঙ্গাচড়ার চেংমারীর তিন নারী উমেজা বেগম, এলিজা বেগম ও শিউলী বেগম রাস্তার পাশে বসে গল্প করছিলেন। এর মধ্যে সত্তরোর্ধ্ব উমেজার ছেলের বউ এলিজা ও মেয়ে শিউলি। উমেজা বলেন, ‘থাকলে (মঞ্জুম) দিনু হয়। এ্যালা আল্লায় যাক ভাগ্যত রাখছে, তাকে দেইম।’ এই তিন নারীই বললেন, মঞ্জুমের দান-খয়রাতের কারণে তাঁর কিছু ভোট ব্যাংক আছে। তিনি ভোটে না থাকায় তাঁর প্রভাব ভোট বাক্সে পড়বে।
জেলা নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২২৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৩১ জন। নারী ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯২ জন। হিজড়া ভোটার ৪ জন।
২০০১ সালের পর ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে রংপুর-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মসিউর রহমান (রাঙ্গা)। এরপর তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১৮ সালেও এই আসনে সংসদ সদস্য হন মসিউর রহমান। কিন্তু ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি রংপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হন দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের ভাতিজা ও সাবেক সংসদ সদস্য মকবুল শাহরিয়ার (আসিফ)। তবে ওই নির্বাচনে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
স্থানীয় নেতা-কর্মীর ভাষ্য, গঙ্গাচড়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্যক্তিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী করার দাবির ছিল। এ কারণে এবার তৃণমূল নেতা-কর্মীর দাবির মুখে মসিউর রহমান বা মকবুল শাহরিয়ারকে প্রার্থী করা হয়নি। দলের মনোনয়ন দেওয়া হয় উপজেলার মহিপুরের বাসিন্দা লন্ডনপ্রবাসী মঞ্জুম আলীকে। মঞ্জুম আলী মনোনয়ন পাওয়ার পর ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
গঙ্গাচড়া বাজারে জাতীয় পার্টির কর্মী ফিরোজ মিয়ার সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ভোটে আমাগো আগ্রহ তেমন নেই। পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে।’ এই কর্মীর ভাষ্য, মঞ্জুম আলীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় ভোটার উপস্থিতি কম হবে।
মঞ্জুম আলীর ভাই ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. আবদুলা আল হাদী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাইয়ের যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব নেই। কিন্তু ভুল করে লেখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে তাঁরা তাঁকে (মঞ্জুম) বৈধ ঘোষণা করেন। কিন্তু হাইকোর্ট থেকে বাতিল করলে তখন আর কিছু করার নেই। তাঁর দাবি, অন্য দলের প্রার্থীরা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু তাঁরা কাউকে সমর্থন দেননি। তবে নেতা-কর্মীকে ‘নির্দেশ’ দিয়েছেন যে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তাঁকে ছাড়া অন্য যে কাউকে ভোট দিতে।
গঙ্গাচড়ায় সরেজমিন জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীর জামায়াতের পক্ষে কাজ করার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে গঙ্গাচড়া উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, তাঁদের অন্য কোনো দলকে সমর্থন দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তবে কমিটির সদস্যসচিব গোলাম ফারুক জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার কথা স্বীকার করেন।
বিএনপির প্রার্থী মোকাররম হোসেন জাতীয় পার্টিকে নিয়ে ভাবছেন না বলে দাবি করেন। তাঁর দাবি, আদালত রায় দিয়েছেন। রিট হয়েছে নির্বাচন কমিশন বনাম মঞ্জুম আলী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘মঞ্জুম আলী আছিলো আওয়ামী লীগ। হইছে জাতীয় পার্টি। এখন আমার বিরুদ্ধ জামায়াতের পক্ষে ভোট করবেন।’
তবে জাতীয় পার্টির লোকজন তাঁদের পক্ষে ভোট করছেন না বলে দাবি জামায়াতের ইসলামীর প্রার্থী রায়হান সিরাজীর। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘মঞ্জুম না থাকায় মানুষের মাঝে একটা আলাদা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সেই প্রতিক্রিয়ার ঢেউ নির্বাচনী মাঠে হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে যোগ-বিয়োগ করতে পারে। হয়তোবা তাঁরা তাঁদের মনের কষ্ট থেকে সমর্থন দিতে পারে, সেটি তাঁদের সিদ্ধান্ত। তবে আমরা আমাদের জনবল নিয়ে মাঠে কাজ করছি।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মোছা. জেসমিন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, প্রার্থীরা চোখে পড়ার মতো আচরণবিধি লঙ্ঘন করেননি। আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ করতে গঙ্গাচড়া উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আছেন। এ ছাড়া একজন জেলা যুগ্ম জজও আছেন।