ভাইয়ের কোলে চড়ে এসএসসি পরীক্ষার হলে যাচ্ছে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের তামিম
ভাইয়ের কোলে চড়ে এসএসসি পরীক্ষার হলে যাচ্ছে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের তামিম

মানুষের গল্প

দোকান চালিয়ে পড়ার খরচ জোগাচ্ছে তামিম, ভাইয়ের কোলে করে যাচ্ছে পরীক্ষাকেন্দ্রে

জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী তামিম ইকবাল (১৫)। কোনো দিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি সে। শরীরের জটিলতা, দারিদ্র্য আর পারিবারিক সংকট—সব বাধা পেরিয়েও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ থামেনি। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার সাব্দালপুর গ্রামের এই কিশোর এখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে বাড়ির পুরোনো মুদিদোকান চালায়, আর পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয় বড় ভাইয়ের কোলে চেপে।

তামিম কোটচাঁদপুর উপজেলার সাব্দালপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে। মা বিলকিস নাহার গৃহিণী। বড় ভাই বদিউজ্জামান বিথু। পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছে। জন্মের এক সপ্তাহ পরই তামিমের ডান পা ভেঙে যায়। এরপর শরীরের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক হাড় ভাঙতে থাকে। পরিবারের ভাষ্য, ২০১৬ সাল পর্যন্ত ২৯ বার তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাড় ভেঙেছে।

বড় ভাই বদিউজ্জামান জানান, জন্মের পর থেকেই তামিমের চিকিৎসা চলেছে। ২০১১ সালে তাঁর বাবা কিডনি রোগে আক্রান্ত হন। পরে ২০১৭ ও ২০২৩ সালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে সংসারে নেমে আসে চরম অভাব। পরিবারের দায়িত্ব নিতে বদিউজ্জামান নিজের পড়াশোনা ছেড়ে অন্যের দোকানে কাজ শুরু করেন।

সংসারের এমন বাস্তবতায়ও তামিম পড়াশোনা ছাড়তে রাজি হয়নি। পরিবারের পুরোনো দোকানটিই হয়ে ওঠে তার ভরসা। ২০২৩ সাল থেকে বাড়ির সেই মুদিদোকান চালানো শুরু করে সে। মাঝেমধ্যে মা সহযোগিতা করেন। দোকান থেকে মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় হয়। সেই অর্থে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসারেও সহায়তা করে সে।

তামিম জানায়, ঠিকমতো প্রাইভেট পড়তে পারবে না ভেবে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়নি। মানবিক বিভাগ নিয়ে পড়ছে। এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার আশা তার। ভবিষ্যতে ভালো পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি করতে চায়।

নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে বাড়ির পুরোনো মুদিদোকান চালায় তামিম

তামিমের স্কুলজীবনও ছিল সংগ্রামের। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কখনো বাবা, কখনো বড় ভাই তাকে কাঁধে বা কোলে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে গেছেন। বর্তমানে তালসার কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে তামিম। বাড়ি থেকে স্থানীয় যানবাহনে কেন্দ্রে নেওয়ার পর ভাই তাকে কোলে করে ভেতরে পৌঁছে দেন। পরীক্ষা শেষে অন্যরা বেরিয়ে যাওয়ার পর ভাই গিয়ে তাকে নিয়ে আসেন।

তামিম বলে, কখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি সে। শরীরের নিচের অংশ ও দুই হাত স্বাভাবিক নয়। তবু সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে নিজের খরচ নিজেকেই জোগাতে হয়। তারপরও ভালো ফল করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী সে।

সাব্দালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. হাসমত আলী বলেন, ‘তামিম খুবই ভালো ছেলে। পড়ালেখার প্রতি তার খুব আগ্রহ। দরিদ্র পরিবারের ছেলে হয়ে এই শরীর নিয়ে নিয়মিত পড়ালেখা করে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, সামান্য সহযোগিতা পেলে তামিম আরও ভালো কিছু করতে পারবে।