বরগুনার আমতলী উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বিতরণে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা বিতরণ কমিটির অনুমোদন ছাড়াই ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত একাধিক ভুয়া ব্যাংক হিসাবে ৯০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। জালিয়াতি শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হিসাবগুলোতে থাকা ২৪ লাখ ১১ হাজার টাকার লেনদেন স্থগিত করে। তবে এর আগেই বাকি ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সোনালী ব্যাংকের আমতলী শাখা ও বরগুনা কোর্ট বিল্ডিং শাখার পাশাপাশি বরিশালের চকবাজার ও কলেজ রোড শাখার বিভিন্ন হিসাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা জমা হয়। আমতলী উপজেলার বাসিন্দা মো. তোফাজ্জল হোসেন সোনালী ব্যাংকের এই চার শাখায় নিজের নামে এবং স্ত্রী ও বোনের নামে একাধিক ভুয়া ও অননুমোদিত ব্যাংক হিসাব খুলে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজরে এলে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত দল গঠন করা হয়। তদন্তে প্রাথমিকভাবে জালিয়াতির সত্যতা পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তোফাজ্জল হোসেন বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কালীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তিনি আমতলীর সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এ কে এম সামসুদ্দিনের (শানু) ভগ্নিপতি। ৪৭০ নম্বর গেজেট অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে তোফাজ্জল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। তবে স্থানীয় অনেক মুক্তিযোদ্ধার দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স কম থাকায় তিনি যুদ্ধে অংশ নেননি।
নিয়ম অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার পে–রোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার যাচাই শেষে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। পরে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা বিতরণ কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা হওয়ার কথা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, আমতলী উপজেলার মো. তোফাজ্জল হোসেনের নামে সোনালী ব্যাংকের আমতলী শাখায় একাধিক হিসাবে এই অর্থ জমা হয়েছে। এর মধ্যে একটি সঞ্চয়ী হিসাব অনুমোদিত হলেও একটি এমডিএস (ডিপিএস) হিসাব, দুটি অননুমোদিত সঞ্চয়ী হিসাব, তাঁর স্ত্রী শাহানারা কাজলের নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব ও তাঁর বোন লুৎফা বেগমের সঞ্চয়ী হিসাবে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার অর্থ জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ওই সময় শাখাটির ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন বিশ্বনাথ চ্যাটার্জী ও মো. কাওছার মোল্লা। মো. ইউনুস মিয়া নামের এক ব্যক্তির সোনালী ব্যাংকের বরিশাল কলেজ রোড শাখার একটি হিসাবেও মুক্তিযোদ্ধা ভাতার অর্থ জমা হওয়ার তথ্য মিলেছে। জানা গেছে, তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্র জানায়, কয়েকটি হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন ধরা পড়ার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিশেষ তদন্ত দল বিষয়টি খতিয়ে দেখে। তদন্ত চলাকালে তোফাজ্জল হোসেন লিখিত বক্তব্যে জালিয়াতির বিষয়ে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক ব্যক্তির সহযোগিতায় এসব লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের নিরীক্ষকদের একটি সূত্র জানায়, আমতলী শাখায় মুক্তিযোদ্ধা ভাতার অর্থ লেনদেনে একাধিক অনিয়ম হয়েছে। যাঁদের নামে ভাতা তোলা হয়েছে, তাঁদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা নন। কেউ কেউ ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ভাতা সুবিধা নিয়েছেন। একই সঙ্গে শাখা ব্যবস্থাপকের জিম্মায় থাকা এমআইএস ইউজার আইডির ব্যবহার ও তদারকিতেও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে গাফিলতির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক বিশ্বনাথ চ্যাটার্জী ও মো. কাওছার মোল্লা।
নিরীক্ষা দলের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার নামে ভাতার অর্থ তোলা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৪ জনই ভুয়া বলে শনাক্ত হয়। এসব নামে খোলা ২০টি সঞ্চয়ী হিসাবে ৯০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা জমা হয়। এ ছাড়া ফরিদা বেগম, চম্পা ও মোসাম্মৎ রুনু নামে তিনটি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রোফাইলের বিপরীতে মোট ২৪ লাখ টাকার ঋণ বিতরণের ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, কয়েকজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ভাতার অর্থও অন্যের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা জি এম এ মান্নানের ভাতার ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা তোফাজ্জল হোসেন নিজের নামে, তাঁর স্ত্রী শাহানারা কাজল, বোন তহমিনা ইউনুস ও ফরিদা নামে একজনের হিসাবে জমা করেন। একইভাবে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন তালুকদারের ভাতার ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিজের নামে, বোন লুৎফা বেগম ও তহমিনা ইউনুস নামে একজনের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল ইসলাম তালুকদারের ভাতার ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খালেদা বেগম ও তহমিনা ইউনুসের হিসাবে এবং মুক্তিযোদ্ধা গাজী মো. জালাল উদ্দীনের ভাতার ২ লাখ ১২ হাজার টাকা মো. ইউনুস মিয়ার হিসাবে জমা করে পরে তা তুলে নেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদ আব্দুস সালাম নামে একটি ভুয়া প্রোফাইল খুলে তাঁর ভাতার ৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা তোফাজ্জল হোসেন নিজের নামে, তাঁর স্ত্রী শাহানারা কাজল, হাসিনুর রহমান, খালেদা বেগম ও ইউনুস মিয়ার ব্যাংক হিসাবে জমা করে তুলে নেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে তোফাজ্জল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে তাঁর স্ত্রী শাহানারা কাজল বলেন, তাঁর স্বামী মুক্তিযোদ্ধা নন এবং কোনো ভাতা গ্রহণ করেন না। তাঁর দাবি, ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা তাঁর স্বামীর কাছ থেকে হিসাব নম্বর নিয়ে অপব্যবহার করেছেন এবং ষড়যন্ত্র করে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমতলীর এক বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘আমরা এত বছর নিয়ম মেনে ভাতা পেয়ে এসেছি। কিন্তু কীভাবে আমাদের ভাতার টাকা অন্যের অ্যাকাউন্টে গেল, তা কল্পনাও করতে পারছি না। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
ভুক্তভোগী বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘খালেদা বেগম ও তহমিনা ইউনুস নামে কাউকে আমি চিনি না। অথচ আমার ভাতার টাকা কীভাবে তাঁদের হিসাবে গেল, তা বুঝতে পারছি না।’
প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন তালুকদারের স্ত্রী হোসনে আরা বেগম জানান, তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর তোফাজ্জল হোসেন ওয়ারিশ–সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে ভাতা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরির পর প্রায় সাত থেকে আট মাস পরে তাঁদের হিসাবে ভাতার টাকা আসা শুরু হয়।
সোনালী ব্যাংক আমতলী শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে কলাপাড়া শাখায় কর্মরত মোহাম্মদ জুলকার বিন খালেদ বলেন, ২০২৪ সালের শেষ দিকে দৈনন্দিন লেনদেনের রসিদ যাচাইয়ের সময় কয়েকটি হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন নজরে আসে। পরে যাচাই করে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা ভাতার অর্থ অননুমোদিতভাবে সাতটি হিসাবে জমা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে প্রধান কার্যালয়ের বিশেষ তদন্ত দল বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে।
সোনালী ব্যাংকের বরিশাল অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. মাহমুদুল হক বলেন, আমতলীতে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা উত্তোলনসংক্রান্ত বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন। ব্যাংকের ভিজিল্যান্স ও অডিট দল বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি, তাই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। বিষয়টি তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’