
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশিকুর রহমান চৌধুরীর ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ডুমাইন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আসাদুজ্জামানকে সাময়িকভবে বরখাস্ত করেছে সরকার। মঙ্গলবার দুপুরে স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউপি-১ শাখার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জেসমীন প্রধানের সই করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প আশ্রয়ণ-২–এর কার্যক্রমে বাধা দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা ও সরকারি গাড়ি ভাঙচুরে ইন্ধনের ঘটনায় জড়িত থাকায় ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৪(৪) (খ) (ঘ) ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক। শাহ আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা প্রয়োগ প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণে সমীচীন নয় বলে সরকার মনে করে। তাই তাঁর অপরাধমূলক কার্যক্রম ইউনিয়ন পরিষদসহ জনস্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনায় তাঁকে নিজ পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরবাড়ি নির্মাণ ও জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে ইউএনওর দেহরক্ষী আনসার সদস্যের হাতে এক নারী রক্তাক্ত জখম হলে এলাকাবাসীর হামলায় ইউএনও, আনসার, পুলিশ, ৪ নারীসহ ১৫ জন আহত হন। হামলার সময় ইউএনওর গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। একটি মামলার বাদী ইউএনওর গাড়িচালক সুমন শেখ এবং অপর মামলার বাদী মধুখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার সরকার। দুটি মামলাতেই ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামানকে। পুলিশ তাঁকেসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গতকাল সোমবার তাঁদের মধ্যে ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামানের দুই দিন এবং অপর তিনজনের এক দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন ফরিদপুরের ৫ নম্বর আমলি আদালতের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মারুফ হাসান। ইউপি চেয়ারম্যানের পুলিশি রিমান্ড মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার জেলগেট থেকে তাঁকে বুঝে নেন মধুখালী থানার পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চম্পক কুমার বড়ুয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারের আগে ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ঘটনার সময় তিনি ওই জায়গায় ছিলেন না। ইউএনও সেখানে আসবেন, সে কথাও তাঁকে আগে থেকে জানানো হয়নি। আহত হওয়ার পর ইউএনওর ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান এবং উত্তেজিত নারী-পুরুষদের হাতে–পায়ে ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
জেলা প্রশাসকের ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ এবং প্রজ্ঞাপনে ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ করার বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান যে এ ঘটনায় জড়িত, এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পরই তাঁকে এ মামলার ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি সুপারিশসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। এ কারণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে।’
ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা।
উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শাহ্ মোহম্মদ ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি এখনও প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এর আগেই ইউপি চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিষয়টি বিস্ময়কর। আমরা মনে করি একজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে সঠিক আচরণ করা হয়নি। উপজেলা আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে সভা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে।’
তদন্ত কমিটির সময় বাড়ল দুই দিন
ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনায় গত শুক্রবার জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) লিটন আলীকে আহ্বায়ক করে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিতে তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। মঙ্গলবার তিন দিন শেষ হলেও কমিটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারেনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) লিটন আলী প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি বলে মঙ্গলবার প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে আরও দু–এক দিন সময় দরকার। কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, তাড়াহুড়া করে তদন্ত করা হলে নানা অসংগতি থাকতে পারে। তাই তদন্ত কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটির মেয়াদ আরও দুই দিন বাড়ানো হয়েছে।
ইউনিয়ন আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তার
এদিকে ইউএনওর গাড়িচালক সুমন শেখের করা মামলায় ডুমাইন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাকিল আহমেদ ওরফে টোকনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ডুমাইন বাজার এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শাকিল আহমেদের নাম এজাহারে ছিল না। তদন্তে তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে পাশের মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার রায়নগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মো. রেজা ও ওয়াসিম বিশ্বাস নামের দুজনকে।
এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চম্পক কুমার বড়ুয়া বলেন, নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া মো. রেজা ও ওয়াসিম বিশ্বাসকে মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।