
ময়মনসিংহ-১ সংসদীয় আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। তবে দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কাছে অল্প ভোটের ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন। তিনি দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা। এবার তাঁকে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার।
গতকাল রোববার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে নতুন প্রশাসক নিয়োগের তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন প্রশাসক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন।
সৈয়দ এমরান সালেহ দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিকের দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের পাঁচ জেলায় দল সুসংগঠিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে যুগ্ম মহাসচিব হয়ে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১ আসন থেকে অংশ নেন। হালুয়াঘাট উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সালমান ওমর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় সৈয়দ এমরান সালেহ অনেকটা বেকায়দায় পড়েন। ৬ হাজার ৩৩৯ ভোটের ব্যবধানে তিনি দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এরপর ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে উচ্চ আদালতে মামলা করেন তিনি। ৩ মার্চ বিচারপতি জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনাল আবেদন গ্রহণ করে ব্যালট পেপার-রেজাল্ট শিট হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
স্থানীয় নেতা–কর্মীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা সৈয়দ এমরান সালেহ নির্বাচিত হলে পূর্ণ মন্ত্রিত্ব পাবেন—এমন প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় জেলা পরিষদের দায়িত্ব পাওয়ায় কিছু নেতা–কর্মীর মধ্যে উচ্ছ্বাস এবং কিছু নেতার মধ্যে হতাশা দেখা গেছে।
ধোবাউড়া উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। তারপরও আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেটাকে ভালো মনে করেছেন, সেটাকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা মন্ত্রী পরিষদে ওনাকে চেয়েছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য বৃহত্তর ময়মনসিংহের। তিনি নির্যাতনের শিকার, জেল খেটেছেন, দলকে সংগঠিত করেছেন। নির্বাচনে পরাজয় আমরা মেনে নিতে পারছি না। কিছু সূক্ষ্ম কারচুপি নিয়ে একটি মামলা চলছে, দেখি কী হয়। নির্বাচনের সময় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ড ঘটায় সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও আমাদের কিছু নেতা নির্বাচনে আমাদের পক্ষে ছিলেন না। যেহেতু অল্প ভোটে হেরেছেন, তাই ওনাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।’
ভোটে পরাজিত হওয়া সৈয়দ এমরান সালেহর জন্য যেমন দুঃখজনক, তেমন এলাকাবাসীর জন্যও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন ময়মনসিংহ জেলা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক এনায়েত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন এবং দলের জন্য যথেষ্ট শ্রম দিয়েছেন। কেন্দ্রে ওনার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যাঁরা জানেন, তাঁরা সবাই কষ্ট পেয়েছেন। তাঁকে হয়তো এই পদ দিয়ে কিছুটা সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। জেলা পরিষদ ওনার জন্য ছোট পদ। তিনি দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুকও ছিলেন না, কিন্তু যেহেতু দল বলেছে, তাই দায়িত্ব নিয়েছেন। যদি তিনি নির্বাচিত হতেন, পূর্ণ মন্ত্রী হতেন। এ ধরনের পদ তো ওনার জন্য কিছুই না। ওনার কর্মকাণ্ডের জন্য একটা স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।’
আজ সোমবার সকালে ঢাকায় সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদুল হাসানের কাছে জেলা পরিষদের দায়িত্ব গ্রহণপত্রে স্বাক্ষর করেন সৈয়দ এমরান সালেহ। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশের অন্যতম বৃহৎ জেলা ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বভার নিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেছি। জেলা পরিষদকে শক্তিশালী ও জনগণের কাছে নিয়ে যেতে আত্মনিয়োগ করব। তবে আমি বিশ্বাস করি, এখানে আমার অবস্থান দীর্ঘ মেয়াদে হবে না, যা আদালতের সিদ্ধান্ত ও ব্যালট পুনর্গণনার ওপর নির্ভর করবে।’
সৈয়দ এমরান সালেহ আরও বলেন, ‘জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়াকে ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ হিসেবে কখনোই দেখতে চাই না। যতক্ষণ এই পদে থাকব, তত সময়ে এটাকে জনসেবার একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চাই। রাজনৈতিক কর্মীরা বড় পদের প্রত্যাশা করতেই পারেন, কিন্তু প্রশাসক হিসেবে সরাসরি জেলার উন্নয়নমূলক কাজের তদারক করা এবং মানুষের পাশে থাকার সুযোগটি কাজে লাগাতে চাই। এটি দলের সরকারের প্রতি আনুগত্য এবং নেতৃত্বের আস্থারই প্রতিফলন।’