নিজের ভাতের হোটেলে মমতাজ। সম্প্রতি রাজশাহীর চারঘাট বাসস্ট্যান্ডের পাশে
নিজের ভাতের হোটেলে মমতাজ। সম্প্রতি রাজশাহীর চারঘাট বাসস্ট্যান্ডের পাশে

রাজশাহীতে মমতাজের ভাতের হোটেল

হোটেলের দরজায় পর্দা নেই। তার জায়গায় আছে পরনের একখানা শাড়ি। তার ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে দাঁড়িয়ে থাকেন মমতাজ; কোনো ভ্যানচালক বা বাস থেকে কোনো যাত্রী নেমে তাঁর হোটেলে আসেন কি না দেখতে। কাউকে দেখলেই মমতাজ দরদি গলায় ডাকেন, ‘ভাই, খাইয়া যান। পদ্মার ছোট মাছ আছে, মুরগির মাংস আছে, সবজি আছে।’

রাজশাহীর চারঘাট বাসস্ট্যান্ডের পাশে রাস্তার ধারে টিনের বেড়া দিয়ে বানানো হয়েছে মমতাজ ভাতের হোটেল। কোনো সাইনবোর্ড নেই। মমতাজ নিজেই যেন হোটেলের সাইনবোর্ড। এ জন্য সারাক্ষণ ঝোলানো শাড়ির ফাঁক গলিয়ে মুখ বের করে থাকেন। ১৮ বছর ধরে পাশের একটি হোটেলের কর্মচারী ছিলেন তিনি। গ্রাহকেরা তাঁর চেনা।

মমতাজের স্বামী দুই সন্তানসহ তাঁকে ছেড়ে চলে যান। মমতাজ চারঘাট বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটি ভাতের হোটেলে কাজ নেন। সেখানে ১৮ বছর কাজ করেছেন। মালিক হোটেলটি বন্ধ করে দেবেন জানালে তিনি নিজে এই হোটেল দেন।

সম্প্রতি মমতাজের হোটেলে বসে তাঁ সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, তাঁর বাড়ি চারঘাটের ঝিকরা গ্রামে। বাবার নাম আব্দুর রশিদ। হোটেলে কাজ করেই দুই ছেলেকে বড় করেছেন। তাঁরা এখন বাসচালকের সহকারী। ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে এই নতুন হোটেল করেছেন। এখন সপ্তাহে ৪ হাজার ৫০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। মাসে ২০০ টাকা জমির মালিককে ভাড়া দিতে হয়। বিদ্যুৎ বিল হয় ৩০০ টাকা।

হোটেল বলতে কয়েকখানা টিন দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটি জায়গা। মাঝখানে গোলটেবিল পেতেছেন। তাতে একসঙ্গে চারজনের বেশি বসা যায় না। একটা টেবিল ফ্যান আছে। বেড়ার সঙ্গে একটি পলিথিনে টিস্যু পেপার ঝুলিয়ে রাখেন। এক কোনায় মাটির চুলায় রান্না চলে। একাই সব করেন তিনি। আয়ের উৎসব বলতে এই হোটেল।

মমতাজ বললেন, ‘সব জিনিসের দাম বাইড়ি গিছে ভাই। হোটিল চালানি খুব কঠিন হয়া গিছে। একুন একটাই ভরসা, আগের হোটিলের সব কাস্টমার আমার হাতেই খাইচে। তারা আমার কাচেই আসে।’ মমতাজের সঙ্গে কথা শেষ করে বের হতেই শাড়ির পর্দা সরিয়ে এক ভ্যানচালককে ডাক দিলেন, ‘ভাই, খাইয়া যান।’ ভ্যানচালক বললেন, ‘রুটি খাব। আচে নাকি?’ মমতাজ তাড়াতাড়ি করে বললেন, ‘আচে আচে আসেন।’