
‘সব জিনিসের দাম বাড়তি। পঞ্চাশের মাল ৪০০ টাকায় কিন্যা খাইচ্ছো, বাজারে যাইয়্যা পাঁচের মাল ১০-২০, সেখানে তো ঠিকই কিন্যা খাইছে। আর সর্বনিম্ন ৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা করা হয়্যাছে—এটা বেশি হয়্যাছে? করপোরেশনকে তো আমরাই চালাই। আমাদের টাকায় সিটি করপোরেশন চলে।’ সরকারের উদ্দেশে একটা বাজে কথা বলে ব্যাটারিচালিত এক অটোরিকশাচালক দুই নারী যাত্রীকে ঝড়ের বেগে কথাগুলো শোনালেন। ৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা নেওয়া নিয়ে আপত্তি তুলতেই রিকশাচালক এভাবে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন।
গত সোমবার থেকে রাজশাহী নগরের যেখানে–সেখানে স্বল্পপাল্লার যাত্রীদের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকদের এমন তর্কবিতর্ক শোনা যাচ্ছে। রিকশাচালকেরা বলছেন, সর্বনিম্ন ভাড়া এখন থেকে ১০ টাকা। আর ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা করা হয়েছে।
সাধারণত রাজশাহী সিটি করপোরেশন থেকে অটোরিকশার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা করার দাবিতে সর্বশেষ ২০২২ সালের ২৮ ও ২৯ আগস্ট রিকশাচালকেরা শহরে ধর্মঘট আহ্বান করেছিলেন। তখন সড়ক পরিবহন গ্রুপের পক্ষ থেকে শহরে টাউন সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। তবু ভাড়া বাড়ানো হয়নি।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ সাইদ প্রথম আলোকে বলেন, অটোরিকশার ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, তা–ও তাঁরা জানেন না। সাধারণত বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২০২২ সালে রিকশাচালক সমিতির সভাপতি ছিলেন শরিফুল ইসলাম। আজ বিকেলে কথা বলার জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর মুঠোফোনের সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। অন্তত ১০ জন রিকশাচালকের কাছে সমিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা কেউ বলতে পারেননি যে তাঁদের সমিতির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক কে।
ভাড়া বাড়ানোর সূত্র খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, ৫ টাকার ভাড়ায় ক্রস চিহ্ন দিয়ে ১০ টাকা লেখা এবং ভাড়া বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে লেখা একটি পোস্ট ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে। এতে ৫ টাকার ভাড়া ১০ করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে গাড়ির মূল্যবৃদ্ধি। দেখানো হয়েছে, আগে গাড়ির দাম ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, এখন ২ লাখ ৮০ হাজার। আগে ব্যাটারির দাম ছিল ৪৫ হাজার টাকা, এখন ৮০ হাজার। আগে টায়ার ছিল ৮৫০ টাকা, এখন ২ হাজার ৪০০। আগে চার্জার বিল ছিল ১০০ টাকা, এখন ২২০। আগে ব্রেক শু ছিল ১৬০ টাকা, এখন ৩৬০। রোড মামলা আগে ছিল ৩০০ টাকা এখন হয়েছে ২ হাজার ৬০০।
অটোরিকশার জিনিসপত্রের এই দাম ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করার জন্য নগরের বড় অটোরিকশা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নাহার অটোর ব্যবস্থাপক কাজী মো. তুহিনকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এখন তো কোনো গাড়ির দাম বাড়েনি। বাজেটে আরও কমার কথা। তবে এক থেকে দেড় বছর আগে দাম বেড়েছে। বাড়লেও গাড়ির দাম ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা হয়নি। ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার হয়েছে। তা ছাড়া অন্যান্য যেসব আইটেমের দাম বাড়ানোর দাবি করা হয়েছে, সেগুলো আসলেই বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, সব জিনিসের দামই বাড়ছে। সেখানে সর্বনিম্ন ভাড়া আর পাঁচ টাকা হতে পারে না। এটা ১০ টাকা হওয়াই যৌক্তিক।
অটোরিকশায় উঠলেই ১০ টাকা ভাড়া মানতে পারছেন না যাত্রীরা। রাজশাহী নগরের বেলদারপাড়া এলাকার একজন স্কুলশিক্ষক রেজিনা খাতুনকে তিনবার অটোরিকশার রুট পরিবর্তন করে স্কুলে যেতে হয়। পাঁচ টাকা ভাড়া থাকার কারণে তিনি ১৫ টাকায় স্কুলে যেতে পারতেন। মঙ্গলবার থেকে তাঁকে ৩০ টাকা দিতে হচ্ছে। যেতে–আসতে তাঁর ৬০ টাকা খরচ হচ্ছে। তিনি বলেন, রাজশাহী শহরে অটোরিকশায় উঠলেই ১০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে, এটা অন্যায্য। এটা হতে পারে না।
এদিকে রাজশাহী শহরে যাত্রীর প্রয়োজনের তুলনায় অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে। শহরের রাস্তায় রিকশাজটের কারণে চলাচল যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। এটাকে লাভজনক পেশা মনে করে ছোটখাটো অনেক পেশা ছেড়ে দিয়ে মানুষ শহরে এসে অটোরিকশা চালাতে শুরু করেছেন। এমনকি অনেক মানুষ গ্রাম থেকে শহরের এসে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। এখন অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণ করাই একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী শহরের বুধপাড়া এলাকায় ২২ বছর ধরে রিকশা চালান শফিকুল ইসলাম (৫০)। তিনি পায়ে ঠেলা রিকশাও চালিয়েছেন। তিনি বলেন, শহরের অটোরিকশা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। এ জন্য তাঁদের আয় কমে যাচ্ছে।