
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সরকারি ভূমি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে অভিযোগকারী ব্যক্তি ও তাঁর স্বজনদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির সাবেক এক নেতার বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, তাঁদের হত্যার পর লাশ গুমের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার দুপুরে ফতুল্লার রঘুনাথপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে জমির মালিকের ভাতিজাকে থাপ্পড়ের একটি ভিডিও গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ফতুল্লা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিল্টন রায় সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর।
জমির মালিক দাবি করা কাশেম মোল্লার স্ত্রী কহিনুর আক্তার বাদী হয়ে ইকবাল হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুল হক সরদার বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগে কহিনুর আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী ক্রয়সূত্রে ওই জমির মালিক। প্রায় ১০ বছর ধরে তাঁরা জমিটির খাজনা, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্য খরচ পরিশোধ করে ভোগদখলে ছিলেন। সেখানে একটি টিনশেড ঘরও ছিল। ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় এক বছর আগে ঘরটি ভেঙে জমিটি টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়।
তিনি বিষয়টি থামানোর চেষ্টা করেছেন। দুই পক্ষকে কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র পাওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।মিল্টন রায়, ফতুল্লা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা
কহিনুরের অভিযোগ, এরপর ইকবাল হোসেন ওই জমিতে মালিকানা দাবি করে এক রাতে সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস হলেও রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে ইকবাল তাঁদের নির্মাণকাজ বন্ধ করে জমি দখলের চেষ্টা করেন। পরে জমি নিয়ে বিরোধের ঘটনায় তাঁর স্বামী আদালতে মামলা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, আদালত উভয় পক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
বুধবার ওই জমি সরেজমিন তদন্তের দিন ছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কাশেম মোল্লা ও তাঁর স্ত্রী সেখানে যান। এ সময় ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিল্টন রায় তদন্ত করছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তখন ইকবাল হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা লাঠিসোঁটা ও দেশি অস্ত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। একপর্যায়ে তাঁরা কাশেম মোল্লার ওপর হামলা চালিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। তাঁকে রক্ষা করতে গেলে তাঁর স্ত্রী কহিনুরকেও মারধর করা হয়।
কহিনুরের অভিযোগ, চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ইকবাল ও তাঁর সহযোগীরা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর লাশ গুমের হুমকি দেন। পরে স্থানীয় লোকজন কাশেম মোল্লাকে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে অবস্থিত ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ভূমি কর্মকর্তার সামনে কাশেম মোল্লার ভাতিজা সিয়ামকে (৩০) থাপ্পড় মারতে দেখা যায়। এ সময় সিয়াম মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন।
ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে ভূমি কর্মকর্তা মিল্টন রায় প্রথম আলোকে বলেন, তিনি বিষয়টি থামানোর চেষ্টা করেছেন। দুই পক্ষকে কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র পাওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
এদিকে জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইকবাল হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই জমি অন্য পক্ষই দখলে রেখেছিল। আর ভিডিও করার কারণে ওই ছেলেকে তিনি থাপ্পড় দিয়েছেন।
এর আগে চলতি বছরের ৪ জুন ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জে এক ব্যবসায়ীর জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেন চৌরাঙ্গি গ্রুপের স্বত্বাধিকারী কাজী আব্দুস সাত্তার।
এর আগে চলতি বছরের ৪ জুন ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জে এক ব্যবসায়ীর জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেন চৌরাঙ্গি গ্রুপের স্বত্বাধিকারী কাজী আব্দুস সাত্তার। এ ছাড়া ২০২৪ সালে বাসচালকের সঙ্গে তর্কের জেরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের আসিয়ান পরিবহনের একটি বাস ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
ওই ঘটনার পর ১২ ডিসেম্বর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিক মিনহাজ আমানকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগে ইকবাল হোসেনকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। পরে জাতীয় নির্বাচনের সময় ওই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।