
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের জরাজীর্ণ ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় প্রশাসনিক ভবন ও হলরুম নির্মাণে প্রকল্প অনুমোদন দেয় এলজিইডি।
আটতলা ভিতবিশিষ্ট ছয়তলা ভবন নির্মাণে ১৮ কোটি ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। ৫৪০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের নতুন ভবন নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছ। প্রস্তাবিত জায়গায় সরকারি একটি দপ্তরের পুরোনো ভবন অপসারণ না করায় প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। প্রায় ১৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করা না গেলে প্রকল্পের অর্থ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে অনুরোধ জানিয়ে গত ৬ মে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর কাছে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম। এতে তিনি উল্লেখ করেন, সদর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের ভবনটি জরাজীর্ণ ও অপ্রতুল হওয়ায় জনসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রস্তাবিত স্থানে বর্তমানে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) স্থাপনা অপসারণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।
১৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করা না গেলে অর্থ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলা প্রশাসন জানায়, উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় সম্প্রসারিত প্রশাসনিক ভবন ও হলরুম নির্মাণে প্রকল্প অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন করতে দরপত্রও আহ্বান করা হয়। তবে প্রস্তাবিত ওই জায়গায় বিআরডিবি ভবন রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের তথ্যমতে, ১৯৭৮ সালের ১৩ জুলাই উপজেলা পরিষদের দেড় বিঘা জমি বরাদ্দ দেয় ভূমি প্রশাসন। এরপর ওই জায়গায় বিআরডিবি, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যালয় এবং সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের গুদাম নির্মাণ করা হয়। উপজেলা পরিষদের নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্তের পর ওই জায়গা থেকে ভবন অপসারণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। দুটি দপ্তর নিজেদের স্থাপনা অপসারণ করতে সম্মতি জানালেও বিআরডিবির একতলা ভবনটি অপসারণ করা হচ্ছে না।
এর মধ্যেই গত ১৯ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন আবেদন করেন সদর উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির (ইউসিসিএ) সভাপতি মো. আওলাদ হোসেন। ইউসিসিএ হচ্ছে বিআরডিবির আওতাধীন একটি তৃণমূল পর্যায়ের সমবায় সংস্থা।
রিটের বিষয়ে আওলাদ হোসেন দাবি করেন, উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় প্রথমে অফিসার্স ক্লাবের জায়গায় নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়। আগের প্রস্তাবিত জায়গায় উপজেলা কমপ্লেক্সের নতুন ভবন হলে বিআরডিবি, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কার্যালয় ও গুদাম অপসারণ করতে হবে না। এসব বিষয় নিয়ে তিনি রিট পিটিশন আবেদন করেছেন।
সদর উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলী আজম বলেন, প্রকল্পে আটতলা ভিতবিশিষ্ট ছয়তলা ভবন নির্মাণে ১৮ কোটি ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ইতিমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে বিআরডিবি জায়গা ছেড়ে না দেওয়ায় অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে। ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। সেই অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রস্তাবিত জায়গায় স্থাপনা অপসারণ করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স–সংলগ্ন পূর্ব পাশে প্রস্তাবিত জায়গায় বিআরডিবির একতলা পুরোনো ভবন, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের দ্বিতল ভবন এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের গুদাম রয়েছে। এ দুটি দপ্তর ও গুদামের মধ্যে ফাঁকা জায়গা রয়েছে।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন প্রস্তাবিত জায়গায় পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক এবং পিআইওর কার্যালয়ের গুদাম অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পত্র দেন।
এ বিষয়ে গত ৫ মার্চ বিআরডিবির মহাপরিচালক সরদার মো. কেরামত আলী মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরডিবির কোনো স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে জমিসংক্রান্ত বিরোধ দ্বিপক্ষীয় সভার মাধ্যমে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়।
ইউএনও মৌসুমী নাসরিন বলেন, বিআরডিবিকে বরাদ্দ দেওয়া হলেও শর্ত ছিল—জমির মালিকানা হস্তান্তর করা যাবে না এবং ভাড়া প্রদান করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ভাড়া পরিশোধ করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত জায়গা উপজেলা পরিষদের নামে রেকর্ডভুক্ত।
উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন বলেন, সম্প্রতি তিনি এখানে যোগদান করেছেন। বিস্তারিত জেনে তিনি মন্তব্য করবেন।
উপজেলা পরিষদের সম্প্রসারিত নতুন ভবন নির্মাণের স্থবিরতা সমাধানের জন্য গত ১৩ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণে অপর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা দুঃখজনক বিষয়। রিটের পর অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে এ বিষয়ে সব কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টি সমাধান হবে বলে তিনি আশা করেন।