শরীয়তপুরে এক প্রশিক্ষক দিয়ে চলছে নার্সিং কলেজটি

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে স্থাপিত আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজে প্রায় তিন বছরেও জনবল নিয়োগ হয়নি।

একাডেমিক ভবন আছে, ছাত্রী হোস্টেল আছে, শিক্ষার্থী ভর্তি করে পাঠদানও চলছে। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর হতে চললেও শরীয়তপুরের ডামুড্যায় আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হয়নি। এর ফলে মাত্র একজন প্রশিক্ষক দিয়ে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান।

সরকারি এই নার্সিং কলেজটি স্থাপিত হয়েছে ডামুড্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণের ভেতরে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর নার্সিং কলেজের জন্য সেখানে চারতলা একাডেমিক ভবন, পাঁচতলা ২৭৮ শয্যার ছাত্রী হোস্টেল, দোতলা গ্যারেজ ভবন ও একটি বিদ্যুতের সাবস্টেশন নির্মাণ করেছে। এসব অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা।

২০২৩ সালের নভেম্বরে ওই নার্সিং কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। একই বছর ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করে পাঠদান চালু হয়। তবে সেখানে চালু হয়নি সাতটি ল্যাবের (গবেষণাগার) একটিও। লাইব্রেরি থাকলেও নেই বই। কলেজের অর্থনৈতিক কোড না থাকায় শিক্ষার্থীরা সরকারি উপবৃত্তি পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির ২০০ শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নার্সিং কলেজ সূত্রে জানা যায়, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, নার্সিং ইনস্ট্রাক্টর, প্রভাষক, লাইব্রেরিয়ান, অফিস সহকারী, হিসাবরক্ষক, কম্পিউটার অপারেটর, ল্যাব সহকারী, অফিস সহায়ক, নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে জনবল নিয়োগ প্রয়োজন। তবে জনবলকাঠামো এখনো অনুমোদন না হওয়ায় কোন পদের বিপরীতে কতজন পদায়ন হবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এসএসসি পাসের পর তিন বছরের জন্য এই নার্সিং কলেজে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কোর্সে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন। ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এখন পর্যন্ত মোট ২০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। প্রতি শিক্ষাবর্ষে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। শিক্ষাবর্ষ জুন থেকে পরবর্তী বছরের মে মাস পর্যন্ত। কলেজটিতে ৯০ শতাংশ ছাত্রী এবং বাকি ১০ শতাংশ ছাত্র পড়ালেখা করছেন।

তিন বছর ধরে চলছে নার্সিং কলেজটি। কিন্তু কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী দেওয়া হয়নি। একজন অধ্যক্ষ ও একজন প্রশিক্ষক অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সংযুক্তিতে এসে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। শরীয়তপুরের ডামুড্যায় আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজে

পদায়ন নেই, সংযুক্তিতে এসে চালাচ্ছেন কলেজ

কলেজের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে দুজনকে সংযুক্তিতে এনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন জাহিদ হোসেন। তিনি ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্সিং কর্মকর্তা (সিনিয়র স্টাফ নার্স)। ২০২৩ সালে কলেজটি চালুর সময় বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎকালীন শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাকের অনুরোধে জাহিদ হোসেনকে সংযুক্তিতে নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নার্সিং প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অসীমা রানী দাস সরকার। তিনি ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে গাজীপুরের সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন নার্সিং কলেজ থেকে এখানে সংযুক্তিতে রয়েছেন।

নার্সিং প্রশিক্ষক অসীমা রানী সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চারটি ব্যাচের ২০০ জনের মধ্যে ১৫৭ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসেন। আমার একার পক্ষে একটি কলেজ চালানো খুবই কষ্টসাধ্য। শিক্ষার্থীরা যতটুকু শিক্ষা এই প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রহণ করার কথা, তার ২০ শতাংশ আমরা দিতে পারছি না। জানি না এদের ভবিষ্যৎ কী হবে?’

কলেজের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী বৃষ্টি রানী শীল প্রথম আলোকে বলেন, কলেজটিতে ভর্তির সময় তাঁরা জানতেন না এখানে শিক্ষক নেই। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। এখানে সার্টিফিকেট পাবেন ঠিকই, তবে কী শিখে যাচ্ছেন, তা বুঝতে পারছেন না।

ল্যাব আছে, চালু হয়নি

নার্সিং শিক্ষায় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলেজটিতে সাতটি ল্যাবের মধ্যে একটিও চালু হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিতে পারছেন না। কলেজের একটি লাইব্রেরিও রয়েছে। কিন্তু সেখানে বই নেই। এতে শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ বই পড়া ও বিভিন্ন বিষয়ে অনুশীলনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কলেজের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী রিয়াজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কোর্সটির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে, ল্যাবে ব্যবহারিক পড়ালেখা করা। কিন্তু তা করতে পাচ্ছেন না।

শরীয়তপুরের ডামুড্যায় আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজ

উপবৃত্তি পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা

নার্সিং কলেজ সূত্র জানায়, শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি উপবৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথম বর্ষে একজন শিক্ষার্থী মাসে ১ হাজার ৭০০ টাকা, দ্বিতীয় বর্ষে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং তৃতীয় বর্ষে ১ হাজার ৯০০ টাকা উপবৃত্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু কলেজটির অর্থনৈতিক কোড নম্বর খোলা হয়নি। এ কারণে শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি পাচ্ছেন না।

কলেজের আরেক শিক্ষার্থী আনিসা তাহসিন। তিনি বলেন, কলেজের প্রতিটি বিষয়ের খরচ নিজেদের বহন করতে হচ্ছে। ছোট একটি উপজেলা শহর হওয়ায় টিউশনি বা বিকল্প আয়েরও কোনো জায়গা নেই। অনেক কষ্ট শিক্ষা খরচ চালাচ্ছেন। উপবৃত্তি পেলে আর্থিক চাপ কমত।

কলেজের কক্ষে ইভিএম

কলেজটির লাইব্রেরি কক্ষসহ ছয়টি কক্ষে নির্বাচন কার্যালয়ের ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালাউদ্দিন আইয়ূবী প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইভিএমগুলো সরিয়ে নিতে বলা হবে। লোকবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শিখন সরঞ্জাম সংকট বিষয়ে নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ নানা জায়গায় কথা বলছেন।

নার্সিং শিক্ষায় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলেজটিতে সাতটি ল্যাবের মধ্যে একটিও চালু হয়নি

কলেজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য

কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা জাহিদ হোসেন গত আগস্টে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এভাবে একটি প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। যাঁরা এখানে শিখছেন তাঁদেরই–বা কতটুকু শেখানো যাচ্ছে? সংকট সমাধানে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়ে যাচ্ছেন; কিন্তু কোনো সমাধান হচ্ছে না।