নিপা ত্রিপুরা
নিপা ত্রিপুরা

‘বাধার কথা না ভেবে কাজ শেখার চেষ্টা করেছি’, বললেন নারী ইলেকট্রিশিয়ান নিপা

এলাকার কারও ঘরে বিদ্যুতের সংযোগে সমস্যা কিংবা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামতের প্রয়োজন—তখনই ডাক পড়ে ২২ বছর বয়সী তরুণী নিপা ত্রিপুরার। পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান নিপাও যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে সমস্যা সমাধানে ছুটে যান। খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সৌর প্যানেল স্থাপনের কাজেও সবার ভরসাও তিনি।

নিপা ত্রিপুরার বাড়ি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গাছবান অমৃত পাড়ায়। তাঁর বাবা খুপেন্দ্র ত্রিপুরা জুমচাষি। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট নিপা। প্রবল আগ্রহ থেকেই নিজেকে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে গড়ে তুলেছেন তিনি।

সম্প্রতি এলাকায় গিয়ে নিপা ত্রিপুরার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ইলেকট্রিশিয়ান হওয়া এখনো এলাকায় পুরুষদের পেশা হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যেই এই পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে নানা প্রতিবন্ধকতা পার হতে হয়েছে তাঁকে। এই কাজের প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং সাহস থাকার কারণে তিনি দমে না গিয়ে সব প্রতিবন্ধকতা পার হতে পেরেছেন।

নিপা জানান, শৈশব থেকেই বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। নষ্ট ইলেকট্রনিক সামগ্রী খুলে ভেতরে কী আছে দেখার চেষ্টা করতেন তিনি। বিদ্যুতের তার, সুইচবোর্ড—সবকিছুই তাঁর কাছে কৌতূহল জাগাত। এসব বিষয় নিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছেও ছিল তাঁর। তাই বাড়ির কাছের বিদ্যালয় ছেড়ে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের খাগড়াছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি হাতে-কলমে বৈদ্যুতিক কাজ শেখার চেষ্টা করেন। ২০২০ সালে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি।

নারী বলে এখনো কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। অনেকেই এখনো আমাকে কাজ দিতে চান না। তবে আশার কথা হলো, আমার কাজ দেখে এ ধরনের প্রবণতা কিছুটা হলেও কমছে।
—নিপা ত্রিপুরা, ইলেকট্রিশিয়ান

এসএসসি পাসের পর পাড়ার আশপাশের এলাকায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে ছোটখাটো কাজে তাঁর ডাক পড়ত। পরে এলাকায় প্রায় সব ধরনের বৈদ্যুতিক সমস্যা সমাধানে তাঁর ডাক পড়তে শুরু করে। অনেক সময় সফল, কখনো কখনো সমাধানে ব্যর্থ হতেন।

নিপা জানান, তাঁর কাজ শেখার বড় সুযোগ আসে ২০২৪ সালের নভেম্বরে। ওই সময় বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থা থেকে সৌর প্যানেল স্থাপনের বিষয়ে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি সেখানে অংশগ্রহণ করে প্রশিক্ষণ নেন। পরে বৈদ্যুতিক কাজের বিষয়ে আরও তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান। প্রশিক্ষণ শেষে মূল্যায়নে ভালো ফল করেন তিনি। এর সূত্র ধরে তাঁকে সৌর প্যানেল স্থাপনে ‘সহকারী ইলেকট্রিশিয়ান’ পদে নিয়োগ দেয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘আনন্দ’।

নিপা বলেন, বর্তমানে চাকরির পাশাপাশি অবসর সময়ে এলাকায় বৈদ্যুতিক সমস্যার সমাধানে কাজ করেন তিনি। খাগড়াছড়ি সদর ছাড়াও জেলার দীঘিনালা, পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গায় গিয়েও তাঁকে কাজ করতে হয়। এ পর্যন্ত ১০০টির বেশি বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করেছেন তিনি। অনেক বাড়িতে বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামতের ছোটখাটো কাজ প্রায়ই করি। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও টুকটাক কাজ থাকে।’

সৌর প্যানেল স্থাপন করছেন নিপা ত্রিপুরা। সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে

নিপা ত্রিপুরা বলেন, ‘প্রথমে যখন হাতে-কলমে কাজ শেখা শুরু করি, অনেকেই নানা কথা বলত। অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, মেয়ে হয়ে এত কঠিন কাজ করতে পারব কি না। পরিবার ও আশপাশের মানুষের মধ্যেও এমন ধারণা ছিল। তাঁরা চাইতেন না আমি এই কাজ করি। আমি বাধার কথা না ভেবে শুধু কাজ শেখার চেষ্টা করেছি। একসময় এতে সফলও হয়েছি।’

নিপা আরও বলেন, ‘নারী বলে এখনো কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। অনেকেই এখনো আমাকে কাজ দিতে চান না। তবে আশার কথা হলো, আমার কাজ দেখে এ ধরনের প্রবণতা কিছুটা হলেও কমছে। যাঁরা আমাকে দিয়ে একবার কাজ করান, তাঁরা একই ধরনের কোনো সমস্যার মুখে পড়লে আবার আমাকে ডাকেন।’

নিপার পেশা নিয়ে এখন খুশি তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। তাঁর বাবা খুপেন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ‘মেয়ের কাজে আমরা খুব খুশি। আমরা তাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছি।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আনন্দের আঞ্চলিক কর্মকর্তা শ্যামল অগাষ্টিন রোজারিও বলেন, ‘নিপা আমাদের প্রতিষ্ঠানের একটি প্রকল্পের আওতায় সোলার ও ইলেকট্রনিকস স্থাপনের কাজ করছেন। পাশাপাশি নিজের এলাকায় মানুষের বৈদ্যুতিক সমস্যার সমাধান করে বাড়তি আয় করছেন। তাঁর এ উদ্যোগ পাহাড়ের অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার।’