প্রথম আলোতে হামলা: সাড়ে ১০ মাসেও তদন্ত এগোয়নি, গ্রেপ্তার সবাই জামিনে মুক্ত

দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া প্রথম আলো ভবন। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজারেছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

প্রথম আলো ভবনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সাড়ে ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। হামলার পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারীদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি, অভিযোগপত্রও জমা পড়েনি। অথচ গত ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৩৯ জন, যাঁদের সবাই এখন জামিনে মুক্ত। মামলার তদন্ত তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা বলছেন, নতুন আসামি শনাক্ত করার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।

আরও পড়ুন

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর প্রথম আট দিনে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আরও ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে একজনকে গ্রেপ্তার দেখানোর পর আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৩৯ জন, যাঁদের সবাই এখন জামিনে মুক্ত। মামলার তদন্ত তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা বলছেন, নতুন আসামি শনাক্ত করার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।

মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিবির কর্মকর্তারা হামলাকারীদের পাশাপাশি উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছিলেন। প্রায় ১০ মাস ধরে হামলার সময়ের ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া লাইভ ভিডিও পর্যালোচনা করেও সংশ্লিষ্ট সবাইকে শনাক্ত করতে পারেনি ডিবি। হামলার ছক কারা করেছিল, কত দিন ধরে প্রস্তুতি চলেছিল, এতে অর্থ বা রাজনৈতিক সহায়তা ছিল কি না, এসব প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।

প্রথম আলো (বাঁয়ে) ও ডেইলি স্টারে (ডানে) গত ১৮ ডিসেম্বর সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীরা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে আগুন দেয়
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডার্ক ওয়েবের একটি গ্রুপকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, তারাও নতুন করে কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তাই এখন আসামি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।’

তাহলে এখন কী করবেন—এই প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আপনারা বললে আমরা চার্জশিটের (অভিযোগপত্র) দিকে যেতে চাই।’

তবে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, হামলায় জড়িত আরও দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। যদিও তাঁদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

হামলার ছক কারা করেছিল, কত দিন ধরে প্রস্তুতি চলেছিল, এতে অর্থ বা রাজনৈতিক সহায়তা ছিল কি না, এসব প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।

নতুন আসামি শনাক্ত করার সম্ভাবনা দেখছে না ডিবি

সন্ত্রাসী হামলার পর প্রথম আলো ভবনের দোতলা ও তিনতলায় ভাঙচুর–লুটপাট
ছবি: প্রথম আলো

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, হামলার সময় ঘটনাস্থলে থাকা আরও অনেকের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁদের কেউ কেউ সরাসরি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়েছিলেন। কেউ কেউ হামলাকারীদের সঙ্গে অবস্থান, স্লোগান ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন এবং অগ্নিসংযোগের সময় আশপাশে সক্রিয় ছিলেন।

আমরা যখন ধরাধরি শুরু করি, তখন তাঁরা ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট ডিলিট করে ফেলেন। প্রথম দফায় যেভাবে ধরপাকড় করেছিলাম, পরে সেভাবে আর পারিনি।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম

হামলার রাতের একাধিক ভিডিও ফুটেজ, সংবাদমাধ্যমের ধারণ করা ছবি এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন স্থিরচিত্র সংগ্রহ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ফুটেজ ও ছবি পর্যালোচনা করেও হামলায় জড়িত সবাইকে শনাক্ত করা যায়নি বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আরও পড়ুন

তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যখন ধরাধরি শুরু করি, তখন তাঁরা ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট ডিলিট করে ফেলেন। প্রথম দফায় যেভাবে ধরপাকড় করেছিলাম, পরে সেভাবে আর পারিনি। মোবাইল ফোনে উসকানি দিয়েছে এমন কিছু লোক নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু মোবাইল লোকেশনে ঘটনাস্থলে উপস্থিতি কিংবা লিংক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তাঁদের মামলায় রাখা যায়নি।’

আরও পড়ুন

দুজনকে শনাক্ত, ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত হয়নি

সন্ত্রাসী আক্রমণের প্রতিবাদে মানববন্ধনে প্রথম আলোর কর্মীরা
ছবি: প্রথম আলো

মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ মিনহাজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি মামলার তৃতীয় তদন্ত কর্মকর্তা। আগের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ত্রিদীপ বড়ুয়ার কাছ থেকে তিনি নথিপত্র বুঝে নিয়েছেন। হামলার রাতের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। তিনি বলেন, আগের তদন্ত কর্মকর্তা ছয়জন ছাড়া অন্য কোনো আসামির মুঠোফোন জব্দ করেননি। তাই কেবল ওই ছয়জনের মুঠোফোন ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি।

আগামী দুই মাসের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। তারপর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

মিনহাজ উদ্দিন বলেন, প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলায় জড়িত আরও দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা ঢাকার একটি মাদ্রাসার। তবে তাঁদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

দুই মাসে অভিযোগপত্রের নির্দেশ, আট মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি

হামলা–ভাঙচুরে যোগ দেওয়া একটি দল
ছবি: প্রথম আলো

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর পুড়িয়ে দেওয়া ভবনে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আগামী দুই মাসের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। তারপর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘আমরা সেই বিচারিক কার্যক্রমে সবার সহযোগিতা চাইব, যাতে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয় এবং এই জাতীয় ঘটনা ভবিষ্যতে আমাদের না দেখতে হয়। এই জাতিকে না দেখতে হয়।’

আরও পড়ুন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই নির্দেশের পর আট মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি, অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মামলার অগ্রগতি জানাতে চার মাস আগে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান প্রথম আলোকে বলেন, ভয়াবহ এই হামলার ভিডিও ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা ও স্থিরচিত্রসহ অনেক তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ রয়েছে। সরকারের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে যাঁরা উসকানি দিয়েছেন ও হামলায় অংশ নিয়েছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আতাউর রহমান বিক্রমপুরী জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনায় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর থেকে আটকাদেশে কারাগারে ছিলেন। গত ৩ এপ্রিল তাঁকে প্রথম আলোয় হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে হামলায় উসকানির অভিযোগ রয়েছে।

গ্রেপ্তার ৩৯ জন, সবাই জামিনে মুক্ত

ভবন থেকে মূল্যবান ফাইল, কাগজ, আসবাব, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, সিসিটিভি ক্যামেরা জড়ো করে তাতে আগুন দেয় সন্ত্রাসীরা
ছবি: প্রথম আলো
গত বৃহস্পতিবার রাতে সন্ত্রাসীরা রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা করে ভাঙচুর, লুটপাট চালানোর পরে আগুন ধরিয়ে দেয়
ছবি: স্টার
ঢাকার ধানমন্ডিতে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে বৃহস্পতিবার রাতে ভাঙচুর চালানোর আগে ভবনের সামনে আগুন ধরানো হয়
ছবি: প্রথম আলো

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম আলো ভবনে হামলার পর তেজগাঁও থানার পুলিশ প্রথম আট দিনে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়। ডিবি পরবর্তী প্রায় ১০ মাসে আরও ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। সব মিলিয়ে গ্রেপ্তার হন ৩৯ জন। তাঁদের সবাই এখন জামিনে মুক্ত।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ জনকে প্রথমে ডেইলি স্টার ভবনে হামলার মামলায় এবং একজনকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; পরে প্রথম আলোর মামলায়ও তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পুলিশ বলছে, প্রথম আলোয় হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাওয়ায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

মোট গ্রেপ্তার ও জামিনে মুক্ত হওয়া ৩৯ জন হলেন জাকির হোসেন ওরফে শান্ত, আয়নুল হক কাশেমী, মাইনুল ইসলাম, জুলফিকার আলী ওরফে সৌরভ, আবদুর রহমান ওরফে পলাশ, জোবায়ের হোসেন, আতাউর রহমান বিক্রমপুরী, জাহাঙ্গীর হোসেন, মির্জা মাহমুদ ওরফে কোরবান, মো. হাসান, মো. রাসেল, মো. রুবেল হোসেন, আহাদ শেখ, সোহেল মিয়া, মো. বিপ্লব, রাশেদুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, ইয়াসিন, রিয়াজুল ইসলাম, নাজমুল হাসান, সোহেল রানা, আবদুল বাকের শেখ, আল আমিন, আলমাস আলী, শফিকুল ইসলাম, নিয়াজ মাহমুদ ওরফে ফারহান, খালেদ আহম্মেদ, জান্নাতুল নাঈম, কারি মুয়াজ বিন আবদুর রহমান, নাঈম ইসলাম, সাগর ইসলাম, আবুল কাশেম, ফয়সাল আহমেদ, আজমির হোসেন ওরফে আকাশ, মো. হাশেম, সাইফুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, আজহার হোসেন ও স্বপন মণ্ডল।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আতাউর রহমান বিক্রমপুরী জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনায় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর থেকে আটকাদেশে কারাগারে ছিলেন। গত ৩ এপ্রিল তাঁকে প্রথম আলোয় হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে হামলায় উসকানির অভিযোগ রয়েছে।

গ্রেপ্তার আসামিদের একজন মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম। একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, প্রথম আলোয় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চলাকালে জ্বলন্ত ভবনের সামনে কুড়াল হাতে উল্লাস করছিলেন তিনি। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর ঢাকার উত্তরা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাঁর গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ইসলা বাড়ি গ্রামে। তিনি ঢাকার উত্তরায় থাকেন।

হামলায় অংশ নেওয়া এক সন্ত্রাসীর কুড়াল হাতে উল্লাস প্রকাশ
ছবি: প্রথম আলো

আরেক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হামলার সময় ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা দিচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি বলছিলেন, ‘যেটা ৫ আগস্ট করার কথা ছিল, আমরা পারিনি। আজকে সেটা করেছি হাদি ভাইয়ের উসিলায়।’ পরে ডিবি তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে। তাঁর নাম কারি মুয়াজ বিন আবদুর রহমান। পুলিশ জানায়, তিনি যুব মজলিসের শরীয়তপুর জেলা শাখার নেতা। শরীয়তপুর সদর থানার পশ্চিমকান্দি গ্রামে তাঁর বাড়ি।

হামলার সময় ঘটনাস্থল থেকে প্রথম আলোয় আক্রমণের ছবি ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে অন্যদের হামলায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন নিয়াজ মাহমুদ ফারহান। তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায়।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট গ্রেপ্তার করে জাকির হোসেন ওরফে শান্তকে। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার মশাখালীর চকপাত্রা গ্রামে। তিনি ঢাকার হাজারীবাগে থাকেন। সিটিটিসি-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শান্ত প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় ছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে লাইভ ভিডিও করে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে তা শেয়ারও করেছিলেন।

আরেক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হামলার সময় ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা দিচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি বলছিলেন, ‘যেটা ৫ আগস্ট করার কথা ছিল, আমরা পারিনি। আজকে সেটা করেছি হাদি ভাইয়ের উসিলায়।’

প্রথম দফায় জামিন পান ১০ জন

মব সৃষ্টি করে প্রথম আলো কার্যালয়ের শাটারে ভাঙচুর শুরু করে সন্ত্রাসীরা
ছবি: প্রথম আলো

গত এপ্রিলে প্রথম আলো ভবনে হামলার মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে প্রথম দফায় ১০ জন জামিনে মুক্ত হন। পরে কারাগারে থাকা বাকি আসামিরাও জামিনে বেরিয়ে যান।

প্রথম দফায় জামিন পাওয়া ১০ জন হলেন নাজমুল হাসান, রিয়াজুল ইসলাম ওরফে সুমন, মো. ইয়াসিন, মোহাম্মদ রাসেল, মো. নজরুল ইসলাম ওরফে মিনহাজ, মো. রাশেদুল ইসলাম, জাকির হোসেন ওরফে শান্ত, মো. বিপ্লব, মো. আহাদ শেখ ও মো. রুবেল হোসেন।

তাঁদের মধ্যে ছয়জনের জামিন করিয়েছেন বলে দাবি করে গত ২৪ এপ্রিল সকাল ৬টা ১৯ মিনিটে ‘বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন’ নামের একটি ফেসবুক পেজে পোস্ট দেন আলতাফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তবে কোন ছয়জনের জামিন করিয়েছেন, তাঁদের নাম উল্লেখ করেননি তিনি। গ্রেপ্তার থাকা আরও চারজনের মামলাও তাঁরা দেখছেন বলে পোস্টে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে আতাউর রহমান বিক্রমপুরীও রয়েছেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার আসামিদের মুক্তির দাবিতে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন কারাগারের সামনে ‘বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলনের’ ব্যানারে বিক্ষোভ ও ‘মব’ করার চেষ্টা হয়েছিল। ওই ফেসবুক পেজে প্রথম আলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচারও দেখা গেছে।

একই রাতে সমন্বিত হামলা হয় দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয় ও ছায়ানট ভবনে। প্রথম আলোয় হামলাকারীদের একটি অংশ পরে ডেইলি স্টার ভবনের হামলায়ও যোগ দেয়। পরদিন সন্ধ্যায় উদীচী কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

হামলা ও মামলার পটভূমি

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে উগ্রপন্থী একটি গোষ্ঠী ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ভবনের ফটকের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

একই রাতে সমন্বিত হামলা হয় দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয় ও ছায়ানট ভবনে। প্রথম আলোয় হামলাকারীদের একটি অংশ পরে ডেইলি স্টার ভবনের হামলায়ও যোগ দেয়। পরদিন সন্ধ্যায় উদীচী কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

প্রথম আলো ভবনে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় ২১ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে তেজগাঁও থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, সাইবার সুরক্ষা আইনসহ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়। এর আট দিন পর তেজগাঁও থানা থেকে মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়।

প্রথম আলোয় ভাঙচুর ও আগুন লাগানো হয়েছে। এটি আমাদের দেশে বাক্‌স্বাধীনতার ওপর জঘন্যতম আক্রমণের একটি। আমি আশা করব, পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তারা মনোযোগ দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা সমাধানের ব্যবস্থা করবেন। তাঁদের তৎপরতার অভাব থাকলে যারা বাক্‌স্বাধীনতা খর্ব করতে চায়, তারা প্রশ্রয় পাবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক

মামলায় দাঙ্গা সৃষ্টি করে অবৈধভাবে কার্যালয়ে ঢুকে লুটপাট, ক্ষতিসাধন, হত্যার উদ্দেশ্যে অগ্নিসংযোগ, ভয় দেখানো ও অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রথম আলোর প্রকাশনা বন্ধ ও অফিসের কাজে বাধা দিতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, অনলাইনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দেওয়া এবং অন্তর্ঘাতমূলক কাজের অভিযোগও করা হয়।

হামলার ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। এসব ফুটেজের ভিত্তিতে সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হলেও হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারীরা এখনো অচিহ্নিত।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথম আলোয় ভাঙচুর ও আগুন লাগানো হয়েছে। এটি আমাদের দেশে বাক্‌স্বাধীনতার ওপর জঘন্যতম আক্রমণের একটি। আমি আশা করব, পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তারা মনোযোগ দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা সমাধানের ব্যবস্থা করবেন। তাঁদের তৎপরতার অভাব থাকলে যারা বাক্‌স্বাধীনতা খর্ব করতে চায়, তারা প্রশ্রয় পাবে।’

আরও পড়ুন