কাজে দেরি হলেই গৃহকর্মীর ওপর নেমে আসত নির্যাতনের খড়্গ

গৃহকর্মী মেয়েটির পায়ে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন। পান থেকে চুন খসলেই তার ওপর নেমে আসত নির্যাতনের খড়্গ। বৃহস্পতিবার যশোর জেনারেল হাসপাতালে
ছবি: প্রথম আলো

মেয়েটির বয়স ১২ অথবা ১৩। হাসপাতালের শয্যায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। বাঁ চোখে রক্ত জমেছে। ঠোঁটের নিচে ক্ষতচিহ্ন। দুই পায়ের নখগুলো থেঁতলানো। পিঠে কালচে দাগ। রুটি তৈরির ব্যালন, খুন্তি, ডিশ লাইনের মোটা তার দিয়ে এমন অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে মেয়েটির ওপর।

গতকাল বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া সড়কের ব্যাংকপাড়ার একটি বাসা থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় মেয়েটিকে উদ্ধার করে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ। পরে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরীর বাড়ি দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায়। এ ঘটনায় নির্যাতনের অভিযোগে সরকার শামীম আহমেদ (৩২) ও তাঁর স্ত্রী জান্নাত জুঁইকে আটক করেছে পুলিশ। শামীম একটি কীটনাশক কোম্পানির বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া সড়কে ওই দম্পতির বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত নির্যাতনের শিকার মেয়েটি।

ওই দম্পতি ৯ মাস ধরে তাকে নির্যাতন করে আসছেন বলে অভিযোগ করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই কিশোরী। সে প্রথম আলোকে বলে, তাকে সময় বেঁধে ঘরের সব কাজ করতে হয়। কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা, থালাবাসন পরিষ্কার, মসলা বাটাসহ সব কাজ। কোনো কাজে একটু সময় বেশি লাগলে রুটি বানানোর ব্যালন, ডিশ লাইনের তার আর সেলাই রেঞ্জ দিয়ে নির্যাতন করতেন গৃহকর্ত্রী জান্নাত ও তাঁর স্বামী। গতকাল সন্ধ্যায় ছাদ থেকে কাপড় তুলে আনতে একটু দেরি হওয়ায় ব্যালন দিয়ে ব্যাপক মারধর করেন। এতে তার চোখে রক্ত জমে যায়। সেলাই রেঞ্জ দিয়ে পায়ের নখ থেঁতলে দেন। চিৎকার করলে মেরে ফেলার ভয় দেখান। ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারে না। রাতে দরজা খোলার সময় পাশের বাসার একজন তাকে দেখে ঘটনা জানতে চান। তখন সে তাঁকে ঘটনা খুলে বলে। পরে রাতে পুলিশ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপপরিচালক) হারুন অর রশিদ বলেন, মেয়েকে রাত ১টা ১০ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার চোখ, মুখ, মাথা, হাত, পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন আছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ভর্তি করা হলেও এখন শঙ্কামুক্ত। তবে মানসিকভাবে মেয়েটি ভীতসন্ত্রস্ত।

কয়েক বছর আগে ওই কিশোরীর বাবা মারা গেলে তার মায়ের অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়। তখন থেকে ওই কিশোরী তার নানির বাড়িতে থাকত। পরে তার মায়ের পরিচিত শামীমের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতে তাকে যশোরে পাঠানো হয়। ৯ মাস আগে ওই কিশোরীকে যশোরে ভাড়া বাড়িতে নিয়ে আসেন শামীম।

ভুক্তভোগী কিশোরী জানায়, এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত সে। লেখাপড়া করানোর কথা বলে যশোরে আনলেও তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়নি। তিন বেলা ঠিকমতো খেতেও দেওয়া না। মাঝেমধ্যে তার মাকে কিছু টাকা পাঠাতেন গৃহকর্তা। ওই দম্পতির যমজ সন্তানের দেখাশোনাও করতে হতো তাকে।

কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস বলেন, ৯৯৯-এ কল পেয়ে তাঁরা মেয়েটিকে উদ্ধার করতে যান। শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া সড়কের একটি বাড়ি থেকে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই সঙ্গে নির্যাতনকারী গৃহকর্তা সরকার শামীম আহমেদ ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। মেয়েটির মায়ের কাছে খবর পাঠানো হয়েছে। দিনাজপুর থেকে তিনি রওনা হয়েছেন। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দিলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।