বাঁ থেকে কাউসার, রাহিম ও বায়েজিদ। ইউরোপের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়ার আগে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় তোলা ছবি। নৌকাডুবির পর রাহিম ও কাউসারের সন্ধান মিললেও বায়েজিদের এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি
বাঁ থেকে কাউসার, রাহিম ও বায়েজিদ। ইউরোপের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়ার আগে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় তোলা ছবি। নৌকাডুবির পর রাহিম ও কাউসারের সন্ধান মিললেও বায়েজিদের এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির পর ভৈরবের একই গ্রামের দুই তরুণ উদ্ধার, নিখোঁজ একজন

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আদর্শপাড়া গ্রামের সাব মিয়ার বাড়িতে গত সোমবার দুপুরে ঢুকতেই কান্নার শব্দ। উঠানে বসেছিলেন স্বজনেরা। চোখেমুখে উদ্বেগ। বাড়ির ছেলে বায়েজিদ মিয়া (২০) বেঁচে আছেন, নাকি সাগরে নিখোঁজ হয়েছেন, এখনো নিশ্চিত নন তাঁরা।

ইউরোপে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন বায়েজিদ। ১৪ সেপ্টেম্বর লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। ওই নৌকায় বায়েজিদের সঙ্গে একই গ্রামের আরও দুই তরুণ ছিলেন। তাঁরা হলেন কামাল মিয়ার ছেলে রাহিম মিয়া (২৪) ও ছিদ্দিক মিয়ার ছেলে কাউসার মিয়া (২৫)। রাহিম ও কাউসার জীবিত আছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা বর্তমানে গ্রিসের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে আছেন।

বায়েজিদের পরিবার বলছে, দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তিনি মারা গেছেন, এমন নিশ্চিত তথ্যও পরিবার বা উপজেলা প্রশাসনের কাছে নেই।

বায়েজিদের বাবা সাব মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘কত জায়গায় খোঁজ নিচ্ছি, কত মানুষের খোঁজ পাচ্ছি। আমার বায়েজিদের খোঁজ নাই।’ ছেলের বিপদের খবর পাওয়ার পর থেকে বায়েজিদের মা চুমকি বেগম ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।

কাতার থেকে লিবিয়া, পরে সাগরপথে গ্রিস

পরিবারের সদস্যরা বলেন, সাব মিয়া ও চুমকি বেগমের তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে বায়েজিদ তৃতীয় সন্তান। বড় ছেলে রায়হান ইতালিপ্রবাসী। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় বায়েজিদ কাতারে যান। সেখানে সুবিধা করতে না পেরে ছয় মাস পর দেশে ফিরে আসেন। এরপর ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, স্থানীয় দালাল সোহাগ মিয়ার মাধ্যমে গ্রিসে পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি হয়। প্রত্যেকের জন্য ১৪ লাখ টাকা করে চুক্তি হয়। প্রথমে নেওয়া হয় ৯ লাখ টাকা। গ্রিসে পৌঁছানোর পর বাকি পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। ঘরের জমানো টাকা ও ঋণ করে ৯ লাখ টাকা জোগাড় করা হয়। সোহাগ মিয়ার বাড়ি ভৈরব উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের শম্ভুপুর আলুকান্দা এলাকায়।

বায়েজিদ ও কাউসার প্রায় দেড় মাস আগে দেশ ছাড়েন। তাঁদের এক মাস আগে যান রাহিম। প্রথমে তাঁদের সৌদি আরব নেওয়া হয়। সেখানে তাঁরা ওমরাহ পালন করেন। এরপর মিসর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। লিবিয়ায় এক মাসের বেশি সময় থাকার পর ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে গ্রিসের উদ্দেশে নৌকাটি ছাড়ে। গ্রিসের গাভদোস দ্বীপের দক্ষিণে নৌকাটি ডুবে যায়।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবর অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত নৌকায় ছিলেন ৭৭ জন। এ ঘটনায় ৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়। একজনের মরদেহ পাওয়া যায়। ২৫ জন নিখোঁজ আছেন।

নিখোঁজ বায়েজিদ মিয়া

‘আব্বা, আমি বাইচ্চা আছি’

রাহিমের পরিবারেও কয়েক দিন ধরে উৎকণ্ঠা ছিল। গত রোববার রাত ১২টার পর বাড়ির মুঠোফোন বেজে ওঠে। ফোন ধরেন রাহিমের বাবা কামাল মিয়া। তিনি বলেন, ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পান। এরপর কাঁদতে কাঁদতে রাহিম বলেন, ‘আব্বা, আমি বাইচ্চা আছি।’

রাহিম বাবাকে বলেন, একটি জাহাজ এসে তাঁদের উদ্ধার করে। কয়েক দিন তিনি জাহাজেই ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় রাহিম, কাউসার ও বায়েজিদ কাছাকাছি ছিলেন। তাঁরা কিছুক্ষণ একসঙ্গে সাঁতরান। পরে কে কোন দিকে সরে যান, তা তাঁরা জানতে পারেননি।

কামাল মিয়া বলেন, তাঁর দুই ছেলে ইতালিতে থাকেন। তাঁদের দেখে রাহিমেরও ইউরোপে যাওয়ার ইচ্ছা হয়।

রাহিমের মতো কাউসারের পরিবারেও ছিল উৎকণ্ঠা। রোববার রাতে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন আসে তাঁদের কাছে। কাউসারের বাবা ছিদ্দিক মিয়া ফোন ধরে ‘হ্যালো’ বলতেই ছেলের কান্নার শব্দ শুনতে পান। কথা বলতে পারছিলেন না কাউসার। ছেলের কণ্ঠ শুনেই পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

ছেলের গলার আওয়াজ পাওয়ার পর আমার মনে হইছে, আমার আর কোনো আওয়াজ শোনার দরকার নাই। আমার পুত কেমনে বাইচ্চা আছে, এইডা বড় কথা না, বাইচ্চা আছে—এইডাই বড় কথা।
ছিদ্দিক মিয়া, নৌকাডুবির পর উদ্ধার হওয়া কাউসার মিয়ার বাবা

ছিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘ছেলের গলার আওয়াজ পাওয়ার পর আমার মনে হইছে, আমার আর কোনো আওয়াজ শোনার দরকার নাই। আমার পুত কেমনে বাইচ্চা আছে, এইডা বড় কথা না, বাইচ্চা আছে—এইডাই বড় কথা।’ কাউসার পরে বায়েজিদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর কাছেও বায়েজিদের কোনো খবর নেই।

পরিবারের লোকজন জানান, কাউসার কৃষিকাজ করতেন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিদেশ যাওয়ার জন্য পরিবারের সঞ্চয়ের পাশাপাশি চার লাখ টাকা ঋণও করতে হয়েছে।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, বায়েজিদের মৃত্যু হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকৃত অবস্থা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বায়েজিদের প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পর পরবর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।