গাবুরা ইউনিয়নের সরদারপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে মরিয়ম খাতুনের মরদেহের অপেক্ষায় স্বজনেরা। শ্যামনগর, সাতক্ষীরা। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গাবুরা ইউনিয়নের সরদারপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে মরিয়ম খাতুনের মরদেহের অপেক্ষায় স্বজনেরা। শ্যামনগর, সাতক্ষীরা। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাবুরায় মরিয়মের দাফনের প্রস্তুতি, অপেক্ষা মরদেহ পৌঁছানোর

সন্ধ্যা নামার আগেই কবর খোঁড়া শেষ হয়েছে। বাড়ির সামনে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে কয়েকটি পুরোনো কবর। তার পাশেই খোঁড়া হয়েছে আরেকটি কবর। অপেক্ষা শুধু মরিয়ম খাতুনের মরদেহ আসার। স্বজনেরা বলছেন, মরদেহ বাড়িতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে। মরদেহ পৌঁছালেই দ্রুততম সময়ে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা হবে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধের কিনারা ঘেঁষে ইটের সড়কটি চলে গেছে সরদারপাড়ার ভেতরে। সেই সড়কের পাশেই মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর বাড়ি। আজ সোমবার সন্ধ্যার আগমুহূর্তে দেখা যায়, বাড়ির সামনে কয়েকজন নারী জটলা করে দাঁড়িয়ে আছেন। মরিয়মের মৃত্যু, ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং মরদেহ বাড়িতে আসা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন তাঁরা।

বাড়ির সামনে পারিবারিক কবরস্থানে নতুন কবরটি খোঁড়া হয়েছে। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে খেজুরগাছের কয়েকটি ভাঙা ডাল। বাড়ির ভেতরে শোকের পরিবেশ। স্বজনেরা অপেক্ষা করছেন ঢাকায় থাকা মরিয়মের মরদেহের জন্য।

বাড়ির ভেতরে মরিয়মের চাচা মিলন সরদারের ঘরের সামনে কয়েকটি চেয়ার পাতা। সেখানে বসে আছেন কয়েকজন নারী। তাঁদের মধ্যে মরিয়মের চাচি মুন্নী খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী মিলন সরদার প্রবাসে থাকেন। বাড়িতে তিনি থাকায় মরিয়মের মরদেহ আসা থেকে শুরু করে দাফনের প্রস্তুতির দায়িত্ব তাঁকেই সামলাতে হচ্ছে।

মরদেহ কত দূর এসেছে জানতে মুঠোফোনে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন মুন্নী খাতুন। তাঁরা জানান, পদ্মা সেতু পার হয়ে খুলনার কয়রা হয়ে সড়কপথে ফিরছেন। এরপর কয়রার কাশিরহাটখোলা খেয়াঘাট থেকে ট্রলারে করে গাবুরার বাড়িতে যেতে হবে। ফলে মরদেহ পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে।

ফোন রেখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মুন্নী খাতুন বলেন, ‘এখন তো মাত্র সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। মরদেহ পৌঁছাতে অন্তত রাত ১২টা বাজবে। অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহের সঙ্গে নয়জন লোক আছেন। তাঁরা এসে খাওয়াদাওয়া করবেন। তাঁদের জন্য রান্না করে রেখেছি। মরদেহ পৌঁছালে আর দেরি করব না। সব প্রস্তুত আছে। রাতেই গোসল, জানাজা শেষ করে দাফন করে দেব।’

মরিয়মের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াসিন সরদার বলেন, মরিয়ম ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় বড় হয়েছেন। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর, যখন তাঁর বয়স দুই-তিন বছর, তখন থেকেই বলতে গেলে তিনি ঢাকায় ছিলেন। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে মরিয়মদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তিনি গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা জানতে পেরেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, এত অল্প বয়সে মেয়েটা মারা গেল—বিষয়টি খুবই কষ্টের।

মরিয়মদের বাড়ির পাশের বাসিন্দা গোলাম রহমানের বয়স ৮২ বছর। দীর্ঘদিন গ্রাম পুলিশ হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এলাকায় এর আগে এমন বড় ঘটনা তিনি দেখেননি। তিনি বলেন, ‘মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকত। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর তারা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এরপর অনেক দিন তাদের আর এলাকায় আসতে দেখিনি। মেয়েটি পড়াশোনা করত, ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল বলে শুনেছি। এত অল্প বয়সী একটি মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেল—কেন এমন হলো, এর কারণ বা উদ্দেশ্য কিছুই বুঝতে পারছি না।’

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে স্থানীয় নারী সরাবান খাতুন বলেন, মরিয়ম ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকতেন। তবে মরিয়মের দাদা-দাদি এখনো বেঁচে আছেন। মৃত্যুর খবর পেয়ে স্বজনেরা বাড়িতে এসেছেন।

মরিয়মের দাদা ইউনুস সরদার তখন বাড়ির এক পাশে চুপচাপ বসে ছিলেন। কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন না। নাতনির মৃত্যুর খবরে শোকে বৃদ্ধের চোখেমুখে ছিল গভীর বিষণ্নতা।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে রোববার সন্ধ্যায় মরিয়মের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর বাবা মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। মামলায় মরিয়মের স্বামী সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। ওবায়দুর পলাতক।