আরশাদ উল্লাহ চৌধুরী মাহিন
আরশাদ উল্লাহ চৌধুরী মাহিন

‘আমার একটামাত্র ছেলে, ১০ লাখ টাকা খরচ করেও বাঁচাতে পারলাম না’

চট্টগ্রাম বন্দরের অবসরপ্রাপ্ত স্টোরম্যান মাহবুবুল বশর চৌধুরী ও নুর বেগম সংসারে দুই মেয়ের পর ছেলে আরশাদ উল্লাহ মাহিনের (১৮) জন্ম হয়। বড় দুই বোনের সঙ্গে বয়সের ব্যবধান বেশি থাকায় আরশাদ ছিলেন সবার আদরের। বাবা-মায়ের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন আরশাদ। সেই ছেলেকে এভাবে হারাবেন, তা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না মাহবুবুল বশর ও নুর বেগম। কখনো বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন তাঁরা, কখনো কাঁদতে কাঁদতেই মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন মাহবুবুল। দুই মেয়ের স্বামীই সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকেন। মেয়েদের বিয়ের পর ছেলেই কাছে ছিল তাঁর। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে আরশাদ ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, আর চার-পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ করবেন লেখাপড়া, এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু সব স্বপ্ন সড়কেই ঝরে গেল। অবসরজীবনটা এখন কীভাবে টেনে নিয়ে যাবেন জানেন না মাহবুবুল।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে হাটহাজারী উপজেলার নাঙ্গলমোড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে আরশাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, শোকাহত স্বজনেরা সমবেদনা জানাতে ভিড় করেছেন। সেখানে বিলাপ করে কাঁদছিলেন আরশাদের বাবা মাহবুবুল বশর ও মা নুর বেগম।

গত বুধবার দুপুরে হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের চারিয়া বোর্ড স্কুলের সামনে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত হন দুটি গাড়ির ৯ জন। ঘটনাস্থলে নিহত হন সিএনজি অটোরিকশার চালক মুহাম্মদ এরশাদ (৩৮)। গুরুতর আহত হন মাহবুবুলের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছেলে আরশাদ উল্লাহ চৌধুরী।

ঘটনার পর আরশাদ উল্লাহকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সবশেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে পাঁচ দিন পর মারা যান তিনি। আরশাদ এবার হাটহাজারী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। গত সোমবার রাত ১০টায় আরশাদের লাশ বাড়িতে এসে পৌঁছায়। এরপর রাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।

ঘটনার পর আরশাদ উল্লাহকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সবশেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে পাঁচ দিন পর মারা যান তিনি। আরশাদ এবার হাটহাজারী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। সোমবার রাত ১০টায় আরশাদের লাশ বাড়িতে এসে পৌঁছায়। এরপর রাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।

ছেলের কথা বলতে গিয়ে বাবা মাহবুবুল বশর বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ছেলে ওই দিন দুপুর ১২টায় পরীক্ষা দিতে ঘর থেকে বের হয়েছিল। ছেলেকে বিদায় দিয়ে জোহরের নামাজে যাই আমি। নামাজ শেষে ঘরে ফেরার পথে ফোন আসে, পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে ছেলে। তখন আমি ছুটে যাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। গিয়ে দেখি, ছেলের পুরো শরীর রক্তে ভেজা। কথা বলতে পারছিল না। এরপর আমার সব জমানো টাকা খরচ করে চিকিৎসা করেছি। ১০ লাখ টাকার বেশি খরচ করেও বাঁচাতে পারলাম না বুকের ধনকে। আমার একটিমাত্র ছেলে, তাকেই বাঁচাতে পারলাম না।’

মাহবুবুল বশরের বড় দুই মেয়ে রুমি আকতার ও ঊর্মি আকতারের বিয়ের পর কাছে ছিলেন ছেলে আরশাদ। তাঁর অকালমৃত্যুতে পুরো পরিবার এখন অন্ধকারে। ঘটনার পর থেকে মা নুর বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

হাটহাজারী সরকারি কলেজের প্রভাষক মো. আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন আরশাদ। তাঁর মৃত্যুতে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শোকাহত। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আরও জোরদার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

মাহিনের চাচাতো ভাই ও ব্যবসায়ী মুহাম্মদ ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, মাহিনের চিকিৎসায় ১০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে তাঁর বাবার। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য তিনি তাঁর অবসরকালীন পাওয়া ভাতা এবং জমানো সব টাকা খরচ করেছেন। তবু ছেলেকে ফিরে পাননি।