হাওরের ফসল রক্ষায় প্রতিবছর দেওয়া হয় অস্থায়ী বাঁধ। কিন্তু এবার অতিবৃষ্টিতে অনেক হাওরে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। তলিয়ে গেছে কৃষকের ধান। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে
হাওরের ফসল রক্ষায় প্রতিবছর দেওয়া হয় অস্থায়ী বাঁধ। কিন্তু এবার অতিবৃষ্টিতে অনেক হাওরে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। তলিয়ে গেছে কৃষকের ধান। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে

সুনামগঞ্জের হাওরে বাঁধের ফাঁদে বাড়ছে ফসলের ঝুঁকি

সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে দেওয়া বাঁধই এখন নতুন সংকট তৈরি করছে। বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। আবার কোথাও বাঁধ ভেঙে ডুবে যাচ্ছে ধানখেত।
এবার হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় প্রতিবছর এত এত বাঁধের প্রকল্প নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ কেটে দেওয়া এবং বাঁধ রক্ষায় মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। একই হাওরে বাঁধ নিয়ে কৃষকেরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। কেউ চান বাঁধ কাটতে, আবার কেউ রক্ষা করতে। প্রশাসন থেকে বাঁধ কাটা রোধে দুটি এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে। বাঁধ কাটতে গিয়ে মাটিচাপায় একজনের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে।

হাওরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা কৃষক ও গবেষকেরা বলছেন, বছরের পর বছর একই স্থানে অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, নদী-নালা ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে বিবেচনায় না এনে প্রতিবছর কেবল মাটির বাঁধ দিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না।

সুনামগঞ্জের হাওরে এবার কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্পের মাধ্যমে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ হয়েছে।

বাঁধ নিয়ে বিবাদ

সুনামগঞ্জের বড় হাওরগুলোর একটি দেখার হাওর। শান্তিগঞ্জ উপজেলার মহাসিং নদ হাওরের উতারিয়া এলাকায় মিশেছে। এখানে নদে আড়াআড়িভাবে দেওয়া বাঁধটির নাম উতারিয়া। নদের দুই পাশে দক্ষিণ দিকে সাতটি প্রকল্পে বাঁধের কাজ হয়েছে। এতে এবার ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।

উতারিয়া বাঁধের পশ্চিমে ছাইয়াকিত্তা, গুরাডুবা, পূর্বে ডাকুয়া, দিগদাইড় হাওর। এই ছোট হাওরগুলো তুলনামূলক উঁচু জমি। নিচের অংশে রয়েছে মূল হাওর। সম্প্রতি হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিলে গত বুধবার পানিনিষ্কাশনের জন্য উতারিয়া বাঁধের পূর্বদিকে মাটি কেটে একটি নালা করে দেন স্থানীয় কৃষকেরা। কিন্তু পরদিনই প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তারা গিয়ে কাটা অংশ আবার মেরামত করার জন্য স্থানীয় কৃষকদের নির্দেশ দেন। পরে ‘মামলার ভয়ে’ কৃষকেরা নিজ খরচে সেটি আবার ভরাট করেন। এতে হাওরের নিচু অংশে আবার পানির চাপ বাড়ে।

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার সময় সেটি রক্ষায় কাজ করেন হাজারো কৃষক। সম্প্রতি তোলা।

গত শনিবার দেখার হাওরের মেলানি এলাকায় একটি বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে। পরে হাজারো কৃষকের প্রাণপণ চেষ্টার আবার বাঁধটি রক্ষা হয়। দেখার হাওরে জেলার চারটি উপজেলার কৃষকদের প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর ফসলি জমি আছে। একই হাওরের ভেতরে নানা নামে রয়েছে আরও কয়েকটি হাওর।

উতারিয়া বাঁধের ঢালে একটি অস্থায়ী চায়ের দোকান আছে। হাওরের কড়া রোদ থেকে এখানে এসে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কয়েকজন কৃষক। তাঁরা বলছেন, ওই বাঁধের বদলে সেখানে একটি জলকপাট (স্লুইসগেট) হলে এ সমস্যা হতো না। এক যুগ ধরে এ দাবি জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি।

কৃষকেরা মনে করেন, স্থায়ী কাজ হলে প্রতিবছর আর প্রকল্প হবে না। এতে কিছু মানুষের বাঁধ ব্যবসা কমে যাবে। তাই এটি হচ্ছে না। ক্ষোভ প্রকাশ করে আস্তমা গ্রামের কৃষক আল আমিন (৩০) বলেন, ‘বাঁধ না দিলে তো টাকা রুজি হবে না। এর লাগি আমরা কই স্লুইসগেট দেও, তারা দেয় বাঁধ। স্লুইসগেট থাকলে হাওরের ধানের ক্ষতি অইত না।’

গ্রামের আরেক কৃষক মো. কোয়াজ আলী (৭৩) বলছিলেন, ছোটবেলায় তাঁরা হাওরে এত বাঁধ দেখেননি। তখন আরও বেশি বৃষ্টি হতো; কিন্তু হাওরে এ সমস্যা হয়নি। বৃষ্টি হলে বা উজানের ঢল নামলে পানি সহজেই হাওরের খাল বা নদী হয়ে ভাটিতে চলে যেত। এখন পানি যাওয়ার পথ নেই। তাই সমস্যা হচ্ছে।

এদিকে বাঁধ কাটার পক্ষে–বিপক্ষে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ৪ এপ্রিল সদর উপজেলায় ও ১০ এপ্রিল শাল্লা উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। গতকাল রোববার মধ্যনগর উপজেলার ঘোড়াডোবা হাওরের সউলডোয়ারি ফসল রক্ষা বাঁধের কাটা স্থানে মাটি ধসে আরমান হোসেন (১৮) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়।

হাওরে বাঁধের শুরু

মেঘালয় পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত সুনামগঞ্জ। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জি ও সুনামগঞ্জে প্রচুর বৃষ্টি হয়। এতে পাহাড়ি ঢল নামে। একসময় হাওরের ফসল রক্ষায় যেখানে দরকার বাঁধের কাজ স্থানীয় কৃষকেরাই নিজ উদ্যোগে করতেন। হাওরে পানি ধারণক্ষমতা বেশি থাকায় এবং উজানের ঢল বা বৃষ্টির পানি সহজেই নেমে যাওয়া সুযোগ থাকায় বাঁধের তেমন প্রয়োজন পড়ত না।

সুনামগঞ্জের বাসিন্দা আজিজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে হাওরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করেছেন। এখন বাঁধ নিয়ে গবেষণা করছেন। ১৯৬৮ সাল থেকে হাওরে বাঁধ দেওয়া শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব মাটির বাঁধ শুধু ফসলটা নিরাপদে তোলার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে দেওয়া হতো। ফসলের মৌসুম শেষ হলেই কৃষকেরা হাওরে নৌ যাতায়াত ও মাছের প্রজননের জন্য দ্রুত সেগুলো কেটে দিতেন। ধীরে ধীরে বাঁধের প্রকল্প বাড়ে।

একসময় ঠিকাদারি প্রথা ছিল। ২০১৭ সালে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে বাঁধ ভেঙে হাওরে সব ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অনিয়ম–দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরপর ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে স্থানীয়ভাবে কৃষক ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে পিআইসির (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) মাধ্যমে বাঁধের কাজ করা হচ্ছে।

জলাবদ্ধতা থেকে জমির ধান রক্ষায় পানি নিষ্কাশনের জন্য বাঁধ কেটে দিচ্ছেন কৃষকেরা। জেলা সদর উপজেলার জোয়ালভাঙ্গা হাওরে

এ কাজে সরাসরি যুক্ত করা হয় স্থানীয় প্রশাসনকে। জেলা প্রশাসককে প্রধান এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদস্যসচিব করে গঠিত হয় বাঁধের কাজ বাস্তবায়ন ও তদারকে জেলা কমিটি। উপজেলা কমিটির সভাপতি হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। স্থানীয় কৃষক ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে গঠিক পাঁচ থেকে সাত সদস্যের একটি কমিটি একটি প্রকল্পে কাজ করে। একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে। এই পদ্ধতি শুরুতে ভালো মনে হলেও ধীরে ধীরে এর সঙ্গে নামে-বেনামে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশারীরা জড়িয়ে পড়েন। এতে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ফলে কাজে প্রতিবছরই অনিয়ম-গাফিলতির অভিযোগ ওঠে।

গবেষক আজিজুর রহমান বলেন, ‘হাওরের একটা অংশে পানি রিজার্ভ থাকে। আবার সেটির সঙ্গে একটি নালা থাকে। যেখান দিয়ে পানি নিষ্কাশন হয়; কিন্তু এখন রিজার্ভ ট্যাংক নেই, নালাও নেই। হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। আবার বাঁধের সংখ্যা কমাতে হবে। কারিগরি পরীক্ষা-নীরিক্ষা ছাড়া যেখানে-সেখানে বাঁধ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।’

বাঁধের ফাঁদে হাওর

দেখার হাওরের মতো এবার জেলার বিভিন্ন হাওরে অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক ও কৃষকদের পক্ষে থাকা লোকজন বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে সেখানে-সেখানে বাঁধ নির্মাণের ফলেই এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আবার এসব বাঁধের সঙ্গে পানিনিষ্কাশনের সুযোগ কম থাকায় সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। এতে জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওর, জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর, ধর্মপাশার চন্দ্রসোনার থাল হাওর, শান্তিগঞ্জের খাই হাওর, পাখিমারা হাওর, শাল্লার ছায়ার হাওরসহ বেশ কিছু হাওরে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেক হাওরে মানুষ ফসল রক্ষায় নিজ উদ্যোগ পাম্প বসিয়ে পানিনিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন।

এসব এলাকার কৃষকেরা বলছেন, হাওরে প্রতিবছর যেসব মাটির বাঁধ দেওয়া হয়, বর্ষায় পানির তোড়ে সেই বাঁধে মাটি আবার হাওরে গিয়ে পড়ে। এতে হাওর ও হাওরে থাকা নদী-নালা ভরাট হয়েছে। পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আবার উজানের ঢলের সঙ্গেও পলি নামছে। বাঁধের কারণে হাওরে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি এ কে এম আবু নাছার বলেন, ‘বাঁধ দরকার; কিন্তু এত বাঁধ কি দরকার, এখন সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বাঁধই আবার এখন হাওরকে ঝুঁকিতে ফেলছে।’

বাঁধের নামে রাস্তা নির্মাণ

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ২০২০ সালে বাঁধ নির্মাণে নয়টি প্রকল্পে ব্যয় হয় ৬২ লাখ টাকা। পরের বছরই ২৭টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। সদর উপজেলার চলিত নদীর বাঁ তীরে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের নামে নেওয়া ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার ১৪টি প্রকল্প ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তদন্ত করে দেখা যায়, এ প্রকল্পগুলোর সঙ্গে হাওরের ফসল রক্ষার কোনো যোগসূত্র নেই। এটা এলাকাবাসীর চলাচলের রাস্তা। পরে নয়টি প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়।

দুইপাশে ফসলি জমি। মাঝখানে হাওরে যাওয়ার মাটির সড়ক ছিল। এটিকে ফসল রক্ষা বাঁধ দেখিয়ে ১৬ লাখ টাকা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কানলার হাওরের বালিকান্দি গ্রামের পাশে

এর আগের বছর (২০১৯) জেলার দেখার হাওরে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের অভিযোগে একটি মামলাও হয়। প্রতিবছরই ‘অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প’ বা হাওরের ফসল রক্ষার সঙ্গে যুক্ত নয়, এমন অনেক প্রকল্প নিয়ে কথা ওঠে। এবারও সেটি আছে।
সদর উপজেলার কানলার হাওরের পশ্চিম পাড়ে বালিকান্দি গ্রামের পাশে এবার একটি বাঁধ নির্মাণের কাজ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের দুই মাস পর এ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। অথচ স্থানীয় লোকজন বলছেন, এটি হাওরে যাওয়ার গ্রামীণ রাস্তা, ফসল রক্ষা বাঁধ নয়। ১৬ লাখ টাকার এ প্রকল্পের সদস্যসচিব স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ মিয়াও স্বীকার করেন, এটির কারণে হাওর থেকে মাড়াই করা ধান, মাছ সহজে আনা যাবে।

জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের গোরেশনগর গ্রামের রাস্তাটিও ফসল রক্ষা বাঁধের নামে করা হয়েছে। উপজেলা কমিটি থেকে এ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়নি, কিন্তু জেলা কমিটিকে ‘ম্যানেজ করে’ অনুমোদন নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে জোয়ালভাঙ্গা হাওরে সুরমা নদীর তীরের রাসনগর এলাকায় একটি বাঁধ দেওয়া হয়েছে যাতে নদীর পানি হাওরে ঢুকতে না পারে। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিলে এখন পানিনিষ্কাশনের জন্য সেটির কিছু অংশ কেটে দেন স্থানীয় কৃষকেরা। এ হাওরের পশ্চিম পাড়ের কৃষকেরা বলছেন, এই বাঁধ অপরিকল্পিতভাবে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে হাওরের পানিনিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে।

সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের ইছাগড়ি গ্রামের কৃষক ও সাবেক ইউপি সদস্য রেদোয়ান আলী (৪৭) বলেন, ‘আমার গ্রামের পাশে ২০১৮ সালে একটি বাঁধ দেওয়ার কারণে এটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে আমার বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত হয়েছিল। এখন দেখি সবখানেই এভাবে বাঁধ হচ্ছে, কেউ কোনো কথা বলে না।’

এ প্রসঙ্গে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, প্রতিবছরই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের বিষয়ে প্রশাসন ও পাউবোকে জানানো হয়। কিন্তু এ কাজে সবার যোগসাজশ থাকে, যে কারণে কোনো ফল হয় না।
প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই ও মানুষের মতামত নেওয়ার হয় বলে দাবি সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর বিভাগ-২) মো. শামসুদ্দোহার। তিনি বলেন, পানিনিষ্কাশনের জন্য বিভিন্ন হাওরে ৫৮টি রেগুলেটর আছে। তবে সব কটি সচল নয়। যেহেতু ফসল রক্ষা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত, তাই বাঁধ দিতে হবে। একই সঙ্গে হাওরের প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়েও ভাবতে হবে। বিষয়গুলো মাথায় রেখেই তাঁরা কাজ করছেন।

প্রতিবছর কাজ হয়, তবু ব্যয় কমে না

স্থানীয় কৃষক ও নানা শ্রেণি–পেশার লোকজন বলছেন, হাওরে এত এত বাঁধ নির্মাণের ফলেও ফসলের ঝুঁকি কমছে না; বরং বাড়ছে। হাওরের ক্ষতি হচ্ছে।

পাউবোর তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ সালে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৬৫টি প্রকল্পে ১ হাজার ৩৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, শুরুতে ব্যয় বেশি হলেও ধীরে ধীরে তা কমবে। প্রথম দু-এক বছর কাজ কিছুটা কম হলেও পরে বাড়তে থাকে। ২০১৮-১৯ সালে ব্যয় হয় ৮০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ সালে ১০২ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০১ কোটি টাকা ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়।

২০২২-২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়। ওই বছর ১ হাজার ৬৪টি প্রকল্পে ৭৩৭ কিলোমিটার কাজে ব্যয় হয় ১৫৫ কোটি টাকা। পরের বছর ২০২৩-২৪ সালে ১০১ কোটি টাকা ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়।

এবার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটারে কাজ হয়েছে। এর বাইরে ঠিকাদারের মাধ্যমে ৩০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি হাওরে প্রায় ১৭ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধের কাজ করছে পাউবো। এ কারণে কাবিটার কাজে প্রকল্প ও ব্যয় আরও কম হওয়ার কথা; কিন্তু সেটি হয়নি।

প্রকৃতিবান্ধব বাঁধের তাগিদ

বাঁধের কাজে কোনো অবহেলা বা গাফিলতির অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে দাবি সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও হাওরে বাঁধ নির্মাণ–সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার। তিনি বলেন, এখন কেউ একজন হয়তো মনে করেন কোনো জায়গায় প্রকল্পের দরকার নেই, আবার একই এলাকার আরও ১০০ জন মানুষ দাবি করেন, সেখানে প্রকল্প দরকার। দুই দিকেই মত-দ্বিমত থাকে। বেশি মানুষের মতকে প্রাধান্য দিয়েই কাজ হয়। তবে হাওরে প্রকৃতি-পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ করা যাবে না, এ নির্দেশনা সবাইকে দেওয়া আছে।

হাওরে শুধু ধান নয়, সঙ্গে মাছের কথাও ভাবতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগে অধ্যাপক এ কে এম শামসুল ইসলাম। তাঁর মতে, এবার যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটি চিন্তায় রেখেই বাঁধের কাজ করতে হবে। প্রতিটি বাঁধের পর্যাপ্ত পানিনিষ্কাশন, হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত, প্রকৃতি-পরিবেশবান্ধব কাজ হতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছে উল্লেখ করে এ কে এম শামসুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার মাটির বাঁধ নির্মাণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। যেখানে প্রয়োজনে স্লুইসগেট নির্মাণ করতে হবে। কিছু জায়গায় প্রকৃতিবান্ধব স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করা যায়। হাওর, নদী-নালা খনন করতে হবে।

হাওর–গবেষক আজিজুর রহমান বলেন, ভাগবাঁটোয়ারার বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নয়, প্রতিটি প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। স্থানীয় মতকে গুরুত্ব দিতে হবে।