ভুক্তভোগী মাহবুর রহমান
ভুক্তভোগী মাহবুর রহমান

মাহাবুর ও মাহবুরের পার্থক্য দেখল না পুলিশ; হাজতবাস, জামিন নিয়ে ফিরলেন বাড়ি

রাত তখন দুইটা। গভীর ঘুমে ছিলেন মাহবুর রহমান (৫৬)। হঠাৎ বাড়ির প্রধান ফটকে কড়া নাড়ার শব্দ। বাইরে থেকে পুলিশ পরিচয় দেওয়ায় ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতে যান তিনি। এর আগে সাড়া না পেয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রাচীর টপকে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েন।

দরজা খোলার পর পুলিশ সদস্যদের পরিচয় নিশ্চিত হন মাহবুর। জানতে পারেন, চেক জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আসামি হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে পুলিশ। মাহবুর তখন পুলিশকে জানান, তাঁর নামে কোনো মামলা নেই। কারও সঙ্গে তাঁর কোনো আর্থিক লেনদেনও হয়নি। কিন্তু তাঁর কথায় কর্ণপাত না করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরদিন বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন মাহবুর। পুলিশের এই ভুল গ্রেপ্তারে তাঁর সম্মানহানি ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছে পরিবার।

এ ঘটনা গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার পৌরিয়া গ্রামে। মাহবুর রহমান বীরগঞ্জ উপজেলার জগদল উচ্চবিদ্যালয়ের অফিস সহকারী, বিদ্যালয়ে মাঝেমধ্যে পাঠদানও করেন তিনি। মাহবুরের ছেলে নাঈম ইসলাম (২৫) ঢাকায় পড়ালেখার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাবার সমস্যার কথা শুনে ঢাকা থেকে ছুটে আসার সেই রাতের অভিজ্ঞতা এখনো ভুলতে পারছেন না তিনি।

রোববার বিকেলে মুঠোফোনে নাঈম বলেন, ‘বাড়ি থেকে ফোন করে শুধু বলা হয়েছিল, তোমার বাবার একটা সমস্যা হয়েছে, তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসো। ফোনে কথা শুনে মনে হয়েছিল বাবা হয়তো খুব অসুস্থ, নয়তো পৃথিবীতে নেই। অফিসে যোগাযোগ করে প্লেনের টিকিট কেটে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিই।’

নাঈম বলেন, ‘শুক্রবার সকালে বাড়িতে এসে শুনি, বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। বাড়ির কেউ ঠিক করে বলতে পারছিল না কেন তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে। পরে বেলা ১১টার দিকে থানায় যাই। কিন্তু সেখানে বাবার সঙ্গে আমাকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। বেলা তিনটার দিকে তাঁকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পরে আদালত থেকে জামিন নিই।’

প্রকৃত আসামির নাম, পিতার নাম ও ঠিকানার সঙ্গে মিল থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ওয়ারেন্টের (পরোয়ানা) কাগজে মায়ের নাম কিংবা কোন ধরনের ফোন নম্বর থাকে না। এ কারণে অধিকতর যাচাই-বাছাই সম্ভব হয়নি।
সেলিমুর রহমান, ওসি, কাহারোল থানা

ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে কাহারোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিমুর রহমান বলেন, ‘প্রকৃত আসামির নাম, পিতার নাম ও ঠিকানার সঙ্গে মিল থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ওয়ারেন্টের (পরোয়ানা) কাগজে মায়ের নাম কিংবা কোন ধরনের ফোন নম্বর থাকে না। এ কারণে অধিকতর যাচাই-বাছাই সম্ভব হয়নি।’

বাবাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নাঈম বলেন, ‘অপরাধ না করেও বাবাকে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে মাদক মামলার আসামিদের সঙ্গে রাখা হয়েছে। এটা আমাদের পরিবারের জন্য খুবই কষ্টের ও অপমানের।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশের কাছে প্রকৃত ঘটনা জানতে চাইলেও কিছু জানানো হয়নি। আদালতে গিয়ে জানতে পারি, এই মামলার প্রকৃত আসামি একজন ব্যবসায়ী। তাঁর নাম মাহাবুর রহমান, আর আমার বাবার নাম মাহবুর রহমান। নামের বানানে সামান্য পার্থক্য থাকলেও আসামির পিতার নাম ও ঠিকানার সঙ্গে বাবার নামের কিছুটা মিল থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাহাবুর রহমানের বাড়ি পৌরিয়া গ্রামের সুধারুর মোড়। আর মাহবুর রহমানের বাড়ি পৌরিয়া গ্রামের পুলিয়া পাড়ায়। দুই পাড়ার দূরত্ব আনুমানিক দুই কিলোমিটার।

এ বিষয়ে জানতে মামলার বাদী সেলিম মঞ্জুর (৩৮)–এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। পেশায় ব্যবসায়ী সেলিম জানান, মামলার প্রকৃত আসামি কাহারোল উপজেলার পৌরিয়া গ্রামের সুধারুর মোড় এলাকার বাসিন্দা মাহাবুর রহমান। তিনি তাঁর পূর্বপরিচিত।

সেলিম বলেন, গত বছর মাহাবুর তাঁর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ধার নিয়ে লাইব্রেরির ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। টাকা নেওয়ার সময় সেলিমের কাছে একটি ব্যাংক চেক জমা দেন তিনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ওই টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও টাকা পরিশোধ না করায় আইনি পদক্ষেপ নেন সেলিম। গত ১ এপ্রিল দিনাজপুর আদালতে চেক জালিয়াতির মামলা করেন তিনি। পরে মামলায় প্রকৃত আসামি মাহাবুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

শুধু নাম, পিতার নাম ও আংশিক ঠিকানা মিলে যাওয়ার কারণে একজন নির্দোষ মানুষকে রাতের আঁধারে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। পুলিশ চাইলে আরও যাচাই করে নিশ্চিত হতে পারত। কারণ, বাবার বয়স ৫৬ বছর আর প্রকৃত আসামির বয়স ৩২ বছর। আমরা এ বিষয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করব।’
নাঈম ইসলাম, ভুক্তভোগীর ছেলে

নাঈম ইসলামের অভিযোগ, ‘পুলিশের অনেক সদস্যই আছেন, যাঁরা মাহাবুরকে আগে থেকেই চেনেন। অনেকে তাঁর দোকানে আড্ডাও দেন। মাহাবুরের চেকের টাকা পরিশোধের বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্যদের নিয়ে বিচার সালিসও হয়েছে। এত কিছুর পরও পুলিশ মাহাবুরকে চিনতে পারল না এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মত নয়।’

নাঈম বলেন, ‘শুধু নাম, পিতার নাম ও আংশিক ঠিকানা মিলে যাওয়ার কারণে একজন নির্দোষ মানুষকে রাতের আঁধারে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁর সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে, পরিবারের মানুষ আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে। পুলিশ চাইলে আরও যাচাই করে নিশ্চিত হতে পারত। কারণ, বাবার বয়স ৫৬ বছর আর প্রকৃত আসামির বয়স ৩২ বছর। আমরা এ বিষয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করব।’