সাততলার কার পার্কিংটির শুধু নিচতলা ব্যবহৃত হয়। গতকাল চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে
সাততলার কার পার্কিংটির শুধু নিচতলা ব্যবহৃত হয়। গতকাল চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে

বিলাসী বিপণিবিতান, পরীক্ষাগার, ধুলা পরিষ্কারের গাড়িসহ ১৪২ কোটি টাকার প্রকল্প অচল

গাড়ি চলাচল নির্বিঘ্ন ও সহজ করতে চট্টগ্রাম নগরের রাজাখালী খালে সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় সেতু। ৭০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির দুই পাশে নেই সংযোগ সড়ক। তাই চার বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে সেতুটি। এখন সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে হচ্ছে।

চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসেন ক্রেতারা। তাঁদের গাড়ি রাখার জন্য ২০১৭ সালে করা হয় মাল্টিলেভেল কার পার্কিং। চার কোটি টাকা ব্যয়ে এই সাততলা স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও কার্যত তার ব্যবহার নেই। কাজে আসছে না, এমন স্থাপনা নগরে আরও আছে। যেমন ১টি খাদ্য পরীক্ষাগার, ২টি বিপণিবিতান, ১টি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স, ১টি খাবার পরীক্ষার গাড়ি, ধুলা পরিষ্কারের ৬টি গাড়ি ও জলাশয় থেকে বর্জ্য সরানোর ১টি গাড়ি। এগুলো প্রায় অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্মিত এমন অন্তত ১১টি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪২ কোটি টাকা। তিনটি প্রকল্প সিডিএর আর বাকিগুলো সিটি করপোরেশনের। সিডিএ প্রকল্প বাস্তবায়নে নিজস্ব তহবিলের অর্থ খরচ করলেও সিটি করপোরেশনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়ন ও উপহারের মাধ্যমে।

এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা জরুরি।
আকতার মাহমুদ, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

৯৫ কোটি টাকার ২ বিপণিবিতান

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছয়তলা বিপণিবিতান। আছে সাধারণ লিফট, এসকেলেটর ও দৃষ্টিনন্দন ক্যাপসুল লিফট। রয়েছে পর্যাপ্ত পার্কিং ও সিসি ক্যামেরায় নিরাপত্তাব্যবস্থা। সিডিএর সল্টগোলা শপিং কমপ্লেক্সে আধুনিক প্রায় সব সুবিধাই রয়েছে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালে নির্মাণ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি। এখানে ১৮৬টি দোকানের মধ্যে ৮২টি বিক্রি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই বিপণিবিতান চালুর ব্যাপারে সিডিএর সাবেক কর্তাদের অনীহা ও উদাসীনতা ছিল। তাঁরা ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেননি।

একই অবস্থা নিউমার্কেট এলাকার সিডিএর বিপণিবিতান ‘বি’ ব্লকের (নিউমার্কেট বি-ব্লক নামে পরিচিত)। ২০১৫ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১০ তলা বিপণিবিতানটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৪৫ কোটি টাকা। এতে দোকান আছে প্রায় ৪৫০টি। ১০ তলা ভবনের প্রথম ও দোতলায় কিছু দোকান খোলা থাকলেও ওপরের তলাগুলোর বেশির ভাগ দোকান বন্ধ।

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছয়তলা বিপণিবিতান। আছে সাধারণ লিফট, এসকেলেটর ও দৃষ্টিনন্দন ক্যাপসুল লিফট। রয়েছে পর্যাপ্ত পার্কিং ও সিসি ক্যামেরায় নিরাপত্তাব্যবস্থা। সিডিএর সল্টগোলা শপিং কমপ্লেক্সে আধুনিক প্রায় সব সুবিধাই রয়েছে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালে নির্মাণ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি।

বিপণিবিতান মার্চেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটির সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড় ঘেঁষে ভবন করা হলেও পাশে প্রতিরোধদেয়াল নির্মাণ করা হয়নি। পানি ঢুকে এসকেলেটর নষ্ট হয়ে গেছে। লিফটও প্রায় সময় অচল থাকে। এখানে কোনো ব্যবসার পরিবেশ নেই। তাই অনেকেই দোকান কিনে ফেরত দিয়েছেন।

সিডিএর চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, একটি বিপণিবিতানের জন্য যে মনোরম ও ব্যবসায়িক পরিবেশ দরকার, তা নিউমার্কেট বি-ব্লকে নেই। পাহাড় থেকে আসা পানি ঠেকাতে দেয়াল দিতে হবে। পাঁচতলা দোকান রেখে ওপরের তলাগুলো বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সল্টগোলা শপিং কমপ্লেক্স আগামী অক্টোবর-নভেম্বরে চালু করা হবে। আর মাল্টিলেভেল কার পার্কিং করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

২০ কোটি টাকার পরীক্ষাগার চালু হবে কবে?

নগরের বিবিরহাটে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার করা হলেও তা ১০ বছরেও চালু হয়নি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের অধীনে তিনতলা ভবনের এ পরীক্ষাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। এতে ৮২টি আধুনিক পরীক্ষা সরঞ্জাম রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জনবল নিয়োগের অনুমোদন না থাকায় পরীক্ষাগারটি চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন জনবল নিয়োগপ্রক্রিয়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

এই পরীক্ষাগারে খাদ্য পরীক্ষার জন্য জার্মানির একটি সংস্থা গাড়ি দিয়েছিল। আনুমানিক দুই কোটি টাকা দামের গাড়িটি ব্যবহার করা হয়নি।

ধুলা পরিষ্কারের জন্য সিটি করপোরেশন একটি গাড়ি কিনেছিল নিজের টাকায়। আর পাঁচটি গাড়ি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছিল। এসব গাড়ির দাম প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ধুলা পরিষ্কারের এসব গাড়ি কার্যত নগর পরিষ্কারের কোনো কাজে আসেনি।

গাড়ি-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবহার নেই

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স উপহার দিয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু এটি রোগী পরিবহনে তেমন ব্যবহৃত হয়নি।

ধুলা পরিষ্কারের জন্য সিটি করপোরেশন একটি গাড়ি কিনেছিল নিজের টাকায়। আর পাঁচটি গাড়ি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছিল। এসব গাড়ির দাম প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ধুলা পরিষ্কারের এসব গাড়ি কার্যত নগর পরিষ্কারের কোনো কাজে আসেনি।

এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে পরীক্ষাগার, যন্ত্রপাতি ও গাড়ি কেনার আগে এগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল ও অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার ছিল। তাহলে জনগণের অর্থ অপচয় হতো না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল-পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ

২০২২ সালে কচুরিপানা ও ভাসমান বর্জ্য পরিষ্কারের জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আটটি উইড হারভেস্টার কিনেছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালের মার্চে এগুলোর একটি দেওয়া হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এগুলো দরকার ছিল না। এখানে এগুলো ব্যবহারের উপযোগী নয়। এখন পড়ে আছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল-পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে পরীক্ষাগার, যন্ত্রপাতি ও গাড়ি কেনার আগে এগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল ও অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার ছিল। তাহলে জনগণের অর্থ অপচয় হতো না।