সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে জেলার আইনজীবীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ ছবি পোস্ট করেছেন মাগুরার আইনজীবীরা
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে জেলার আইনজীবীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ ছবি পোস্ট করেছেন মাগুরার আইনজীবীরা

মন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানালেন আইনজীবীরা, সঙ্গে জেলা জজের থাকা নিয়ে প্রশ্ন

সংস্কৃতিমন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য নিতাই রায় চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ মো. মিজানুর রহমানকে। গতকাল মঙ্গলবার মাগুরা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা একটি ছবিতে এ দৃশ্য দেখা যায়।

ছবিটি মঙ্গলবার ঢাকার বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি ভবনে তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিত আইনজীবীরা।

মাগুরা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মিজানুর তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘মাগুরা জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে এবং মাননীয় এমপি মহোদয়কে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন।’ ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে ফুলের একটি তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হচ্ছে। এ সময় মন্ত্রীর এক পাশে ছিলেন মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেন, আর অন্য পাশে মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ মো. মিজানুর রহমান।

এ ছাড়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক শাহেদ হাসান, জেলা জাতীয়তাবাদী ফোরামের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান খান, সদস্যসচিব কবির হোসেন এবং মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) সাখাওয়াত হোসেনকে ছবিতে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদনক্রমে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য অনুসরণীয় নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিচারকদের নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত ভাবমূর্তি জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে হবে। নীতিমালার ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচারকেরা যত দূর সম্ভব সভা-সমিতি, বিবাহ ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান থেকে বিরত থাকবেন; বিশেষত এমন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না, যেখানে মামলার পক্ষ বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সংযোগ ঘটতে পারে।

নীতিমালার ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, বিচারক জনসমক্ষে রাজনৈতিক দলসমূহের ঊর্ধ্বে থাকবেন। তাঁদের আচরণ যেন কোনো দল বা মতাদর্শের পক্ষে বা বিপক্ষে না যায়। তাঁরা রাজনৈতিক দল বা রাজনীতিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সভা, প্রচারণা বা কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবেন না। এ ছাড়া ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচারক কোনো অবস্থাতেই মামলার পক্ষ, আইনজীবী বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো উপহার বা উপঢৌকন গ্রহণ করবেন না।

জানতে চাইলে মাগুরা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহেদ হাসান বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রীর সঙ্গে জেলা জজের দেখা হওয়াটা সম্পূর্ণ আকস্মিক ছিল। এটি কোনো পূর্বনির্ধারিত বৈঠক নয়।’ তাঁর দাবি, ওই বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ছুটিতে ছিলেন এবং অন্য প্রয়োজনে সেখানে গেলে করিডরে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়।

আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য মো. মিজানুর রহমান বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সমিতির প্রতিনিধি হিসেবে সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। জেলা জজ তাঁদের সঙ্গে যাননি। তিনি অন্যভাবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জানতে চাইলে মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বাংলা একাডেমিতে ব্যক্তিগত একটা কাজে গিয়েছিলাম। সেখানে আকস্মিকভাবে মাগুরার আইনজীবী ও মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দেখা হয়। তো আইনজীবীরা যখন আমাকে ডাকলেন, সৌজন্যতার খাতিরে আমি না করতে পারিনি। এটা কোনো পূর্বপরিকল্পিত অনুষ্ঠান ছিল না, ঘটনাটা পুরোটাই আকস্মিক।’

আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর জানুয়ারি মাসে এক আইনজীবীর চেম্বার উদ্বোধনের মিলাদ মাহফিলেও উপস্থিত ছিলেন ওই বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা। এ তথ্য সামনে আসায় সামাজিক অনুষ্ঠানে বিচারকদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে বিচার বিভাগের দুজন কর্মকর্তা ও জেলার পাঁচজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাঁরা কেউই নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে চাননি। তাঁরা বলছেন, এমন ঘটনা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও প্রভাবমুক্ত ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাঁদের ভাষ্য, বিচার বিভাগের শক্তি শুধু রায়ের মধ্যে নয়; বরং জনমানসে তার গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির ওপরও নির্ভরশীল। এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়, যাতে বিচারককে প্রভাবিত করা সম্ভব—এমন ধারণার জন্ম হয়।