শরীয়তপুরের ৩ আসন

আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট টানার চেষ্টা অনেক প্রার্থীর

বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন সব আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এনসিপি ও গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী আছেন একটি করে আসনে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শরীয়তপুরের তিনটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপ বাড়ছে। কোথাও দলীয় মনোনয়ন ঘিরে বিভাজন, কোথাও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তৎপরতা, আবার কোথাও নেতা–কর্মীদের দলবদল নিয়ে আলোচনা চলছে।

আসন তিনটিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি আসনে ও গণ অধিকার পরিষদ একটি আসনে দলীয় প্রার্থী দিয়েছে।

জেলার তিনটি আসনে নির্বাচন করতে মোট ২৪ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত শরীয়তপুর–১ ও শরীয়তপুর–২ আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই করা হয়েছে। এতে শরীয়তপুর–১ আসনে দুজনের এবং শরীয়তপুর–২ আসনে সাতজনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। ফলে শরীয়তপুর–১ আসনে সাতজন এবং শরীয়তপুর–২ আসনে চারজন বৈধ প্রার্থী রইলেন।

তফসিল অনুযায়ী ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে মনোনয়নপত্র বাছাই। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি। ইসি আপিল নিষ্পত্তি করবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। এরপর আগামী নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা জানা যাবে।

শরীয়তপুরের তিনটি আসনে দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল। গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির এখন প্রকাশ্য কার্যক্রম নেই। ফলে প্রার্থীদের অনেকে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট পেতে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন।

শরীয়তপুর-১ (সদর ও জাজিরা উপজেলা)

বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে শরীয়তপুর-১ আসনে স্থানীয় পর্যায়ে একাংশের ক্ষোভ দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আহমেদ (আসলাম)। তিনি শরীয়তপুর–৩ নির্বাচনী এলাকার ডামুড্যা উপজেলার বাসিন্দা। ওই আসন বাদ দিয়ে তাঁকে শরীয়তপুর–১ আসনে মনোনয়ন দেওয়ায় স্থানীয় বিএনপির একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এই অংশটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য সরদার নাসির উদ্দিনের (কালু) সমর্থক। তাঁরা মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে তাঁর পক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি।

আসনটিতে জামায়াতের মনোনয়ন পেয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি মোশারফ হোসেন (মাসুদ)। তিনি বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি। আসা করছি ভোটাররাও পরিবর্তনের পক্ষে থাকবেন।’

আসনটিতে মোট নয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। বৈধ অন্য প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জালালুদ্দীন আহমদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. তোফায়েল আহমেদ, গণ অধিকার পরিষদের ফিরোজ আহমেদ, নাগরিক ঐক্যের মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম এবং এনসিপির প্রার্থী আবদুর রহমান।

শরীয়তপুর–২ (নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জের সখীপুর থানা)

পদ্মাতীরের এ আসনে মোট ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি সফিকুর রহমান। জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন দলটির চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসেন। এই দুই নেতা নির্বাচন সামনে রেখে গত বছর থেকে মাঠে প্রচার-প্রচারণা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন। প্রধান দুই প্রার্থীর পক্ষ থেকেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট টানার চেষ্টা চলছে বলে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

গত ৭ ডিসেম্বর ভেদরগঞ্জ উপজেলার সফিপুর থানা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুস আলী মোল্লা তাঁর অনুসারীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী সফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভোটারদের সমস্য শুনছি, সমাধানের চেষ্টা করছি। সেই কাজে বিভিন্ন দলের অনুসারীরা থাকতে পারেন। কিন্তু কোনো চিহ্নিত অপরাধী ও স্বৈরাচারকে দলে স্থান দেব না।’ তিনি আরও বলেন, বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ তাঁদের এলাকায় আসতে দেয়নি, রাজনীতি করতে দেয়নি। তাঁরা ধৈর্য ধারণ করে মানুষের কল্যাণে নিভৃতে কাজ করেছেন। এখন সবাই একটি অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতীক্ষায় আছেন।

জামায়াতের প্রার্থী মাহামুদ হোসেন বলেন, ‘এখানে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সেই জিনিসগুলো সামনে রেখে আগাচ্ছি। মাঠে কাজ করতে গিয়ে আমাদের কর্মীরা কিছু প্রতিবন্ধকতায় পড়ছে, সেগুলো প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে দেওয়া হচ্ছে।’

এই আসনে যাচাই–বাছাইয়ে সাতজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বৈধ ঘোষণা করা চার প্রার্থী হলেন বিএনপির সফিকুর রহমান কিরণ, জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মাহমুদুল হাছান, জাতীয় পার্টির (জাপা) জসিম উদ্দিন।

শরীয়তপুর–৩ (ডামুড্যা, গোসাইরহাট ও ভেদরগঞ্জের আংশিক)

পদ্মা ও মেঘনা নদীর তীরবর্তী জনপদ নিয়ে গঠিত আসনটির অধিকাংশ মানুষ কৃষক ও মৎস্যজীবী। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাবেক একান্ত সচিব মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ (অপু)। তিনি কালবেলা পত্রিকার বর্তমান প্রকাশক। তিনি নির্বাচনী এলাকায় বেশ তৎপর রয়েছেন। তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই তিনি বিভিন্ন এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। উঠান বৈঠক করছেন। এর মধ্যে বেশ কিছু আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী বিএনপিতে যোগদান করেছেন। ৫ ডিসেম্বর ডামুড্যা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জানে আলম ওরফে খোকন মাতবর তাঁর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বিএনপির প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদের হাত ধরে বিএনপিতে যোগদান করেছেন।

মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত ১৭ বছর আমরা রাজনীতির মাঠে কাজ করতে পারিনি। পুরো সময়টা আমাদের পালিয়ে ও কারাগারে কাটাতে হয়েছে। এখন দেশে নির্বাচনী পরিবেশ এসেছে। জনগণও আমাদের পাশে রয়েছে। নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করে যাব। এত বেশি জনগণের সাড়া পাচ্ছি, যার জন্য অনেক সময় নির্বাচনী আচরণবিধিও পালন করা যাচ্ছে না।’

আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন পেয়েছেন দলের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে। আমরা সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। নির্বাচনের আচরণবিধি মেনে মাঠে কাজ করছি। এখনো কোনো প্রতিবন্ধকতা বোধ করছি না।’

আসনটিতে নির্বাচন করতে আরও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হানিফ মিয়া ও জাতীয় পার্টির আবদুল হান্নান।