
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামের একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে উদ্ধার ৯৬টি মাইন ধ্বংস করেছে যশোর সেনানিবাসের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। গতকাল সোমবার বিকেলে চার দফা মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে মধুগাড়ি গ্রামের মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়।
গত শনিবার দুপুরে বেতবাড়িয়া গ্রামে নিজের জমিতে মাটি কাটতে গিয়ে মাইনগুলোর সন্ধান পান নুরুজ্জামান কালু নামের এক ব্যক্তি। খবর পেয়ে পুলিশ ও বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জায়গাটি ঘিরে রাখে।
বোমা নিষ্ক্রিয় করার নিয়ম মেনে বিস্ফোরণের সময় সেনাসদস্যরা মাটিতে শুয়ে পড়েন। বিকেল থেকে একে একে বিস্ফোরণ ঘটানো শুরু হয়। প্রথম চারবার সফলভাবে বিস্ফোরণ ঘটে।
গতকাল দুপুরে যশোর সেনানিবাসের ১৯ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ঘটনাস্থলে যায়। উদ্ধার করা মাইনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিরাপদ স্থানে নিয়ে বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেনাবাহিনীর ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর তরিকুল ইসলাম। তাঁরা মাইনগুলো সংগ্রহ করে মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে নিয়ে যান। সেখানে খোঁড়া হয় পাঁচটি বড় গর্ত। মাইনগুলো বস্তায় ভরে গর্তে নামানোর পর ওপরে বালু ও মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
এরপর ইলেকট্রিক তারের সংযোগ দিয়ে সেনাসদস্যরা ৫০০ মিটার দূরে সরে যান। বোমা নিষ্ক্রিয় করার নিয়ম মেনে বিস্ফোরণের সময় সেনাসদস্যরা মাটিতে শুয়ে পড়েন। বিকেল থেকে একে একে বিস্ফোরণ ঘটানো শুরু হয়। প্রথম চারবার সফলভাবে বিস্ফোরণ ঘটে। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের সময় মাঠের মাটি উড়ে যায়। এতে আশপাশের লোকজনের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ছোটাছুটি শুরু করেন।
ভয়াবহ এই অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বেতবাড়িয়া গ্রামের কৃষক হানা মিয়া, বাহাদুর, মিরন ও লালু বলেন, প্রথমে তাঁরা মনে করেছিলেন যে এই জিনিস খালি বাক্স। বিস্ফোরণের শব্দে তাঁরা ভয় পেয়ে গেছেন।
হাতে নিয়ে জিনিসগুলো নেড়েচেড়ে দেখার কথা জানান স্থানীয় নির্মাণশ্রমিক মামুন মিয়া। বিস্ফোরণের আগে তিনি ভাবতেই পারেননি এগুলো এত মারাত্মক হতে পারে। এখন পুরো এলাকার মানুষ ভয়ের মধ্যে আছেন, আরও মাইন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কি না, সেই চিন্তায়।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফার ধারণা, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হয়তো মাইনগুলো মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।
মাইনগুলোর মধ্যে ১৭টি ট্যাংক–বিধ্বংসী এবং ৭৯টি মানববিধ্বংসী ছিল। সেনাসদস্যরা নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলো সফলভাবে ধ্বংস করেছেন।মুহাদ্দিদ মোরশেদ, গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
শনিবার মাটি কাটার সময় শ্রমিকেরা প্রথমে ধাতব ছয়টি বস্তু দেখতে পেয়েছিলেন। সেগুলোর গায়ে লেখা ‘পি ডি এফ জি এল ৬৩, লট ৩৭, মাইন ১৯৬৭’। খবর পেয়ে পুলিশ জায়গাটি ঘিরে ফেলে। উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ। দুই দিন পর সেই জায়গা খুঁড়ে ৯৬টি মাইন উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল।
গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাদ্দিদ মোরশেদ বলেন, উদ্ধার করা মাইনগুলোর মধ্যে ১৭টি ট্যাংক–বিধ্বংসী এবং ৭৯টি মানববিধ্বংসী ছিল। সেনাসদস্যরা নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলো সফলভাবে ধ্বংস করেছেন। ওই এলাকায় আরও কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য রয়েছে কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক কোনো বস্তু চোখে পড়লে অবিলম্বে পুলিশকে জানানোর জন্য সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানান তিনি।