
শহরের বুকের ভেতর যে এলাকাগুলোকে বলা হয় ‘আসল চট্টগ্রাম’, সেই পুরোনো নগরের বড় অংশ নিয়েই গঠিত চট্টগ্রাম-৯ সংসদীয় আসন। এই আসন ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে একটি প্রচলিত কথা আছে। এখানে যে দল জেতে, তারাই সরকার গঠন করে। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, বিগত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জয়ী প্রার্থীর দলই ক্ষমতায় গেছে। তাই এই আসনের ভোটের ফল শুধু চট্টগ্রামের নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও কৌতূহল জাগায়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৫ থেকে ২৩ ও ৩১ থেকে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে বিস্তৃত এই আসন। বাগমনিরাম, চকবাজার, বাকলিয়া, দেওয়ানবাজার, জামালখান, এনায়েত বাজার, আলকরণ, আন্দরকিল্লা, ফিরিঙ্গীবাজার, পাথরঘাটা, বক্সিরহাট—এগুলো শুধু কয়েকটি এলাকার নাম নয়; এগুলোই চট্টগ্রামের ইতিহাস, বাণিজ্য আর নগরজীবনের কেন্দ্র।
তবে শুধু ‘পুরোনো এলাকা’ বললে এই আসনের আসল গুরুত্ব ধরা পড়ে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, সংস্কৃতি, ব্যবসা—সবকিছুর কেন্দ্র এই চট্টগ্রাম-৯। ফলে ভোটারদের প্রত্যাশাও এখানে বেশি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতির বড় ঠিকানা
চট্টগ্রামের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই এই আসনের ভেতরে। চট্টগ্রাম কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান আছে এখানে। ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ভালো ফলের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। এটিও এ আসনেরই অংশ। কলেজিয়েট স্কুলও পড়েছে এই আসনে।
স্বাস্থ্যসেবার বড় ভরসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতালসহ বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগনির্ণয়কেন্দ্রও রয়েছে এই আসনে। সংস্কৃতির দিক থেকেও এই আসন আলাদা। শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, থিয়েটার ইনস্টিটিউট, মুসলিম হল; চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখানেই অবস্থিত।
চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ বলা হয় সিআরবিকে। এটিও অবস্থিত চট্টগ্রাম-৯ আসনে। এই এলাকায় ঢুকলেই শহরের কোলাহল থেকে যেন একটু মুক্তি মেলে। চারদিকে সবুজ গাছপালা, বড় বড় শিরীষ, প্রশস্ত সড়ক; মনটা শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু সিআরবিকে ঘিরে নানা সময়ে উন্নয়ন প্রকল্প, স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। ভোটারদের বড় অংশ চান, যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি এই সবুজ এলাকাটিকে রক্ষা করবেন।
চট্টগ্রাম-৯ হলো নগরের প্রাণকেন্দ্র। এখানে সবই আছে, কিন্তু সমস্যাও অনেক। সব জায়গা পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। অনেক জায়গায় সরু ও ভাঙা সড়ক আছে। বিনোদনের জন্য ভালো পার্ক নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধি যেন নাগরিকদের মতামত নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেন, এটাই প্রত্যাশা।সাবেক চেয়ারম্যান, আইইবি (চট্টগ্রাম কেন্দ্র)।
বাণিজ্যের কেন্দ্র
চট্টগ্রামের অর্থনীতির কথা বলতে গেলে খাতুনগঞ্জের নাম আগে আসে। দেশের বড় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি খাতুনগঞ্জ এই আসনের মধ্যেই পড়েছে। ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজারের পাশাপাশি নিউমার্কেট, রেয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, হকার্স মার্কেট—শহরের পরিচিত কেনাকাটার বড় বড় কেন্দ্রও এই আসনে।
এখানেই আছে ফিশারিঘাটের বড় মাছের আড়ত, ফলমন্ডির ফলের আড়ত। খাতুনগঞ্জের রাস্তায় সকাল-সন্ধ্যা একই ছবি—পণ্য নামছে, চলছে দর-কষাকষি। ভোটাররা বলছেন, যে প্রার্থী জিতবেন, তাঁকে এই বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোকে আরও গতিশীল করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা আর নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম-৯–এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় সরকারি দপ্তরগুলোর কারণে। আদালত, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি করপোরেশন—সবই এই আসনের ভেতরে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার এই আসনেরই ভোটার। তিনি বললেন, চট্টগ্রাম-৯ হলো নগরের প্রাণকেন্দ্র। এখানে সবই আছে, কিন্তু সমস্যাও অনেক। সব জায়গা পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। অনেক জায়গায় সরু ও ভাঙা সড়ক আছে। বিনোদনের জন্য ভালো পার্ক নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধি যেন নাগরিকদের মতামত নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেন, এটাই প্রত্যাশা। দেলোয়ার মজুমদার বলেন, কাগজে-কলমে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রও এই আসন। কেননা আদালত থেকে সিডিএ—সবখানেই মানুষের ভিড় লেগে থাকে।
ভোটের ইতিহাস: যে আসনে জিতলেই সরকার
স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক গণ-অভ্যুত্থানে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতন হয়েছিল সামরিক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। এরপর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান জয়ী হন। তিনি পান ৪৯ হাজার ৮১৮ ভোট। আওয়ামী লীগের এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী পান ৪৮ হাজার ২৪৫ ভোট। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। তখন ভোটার ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ২৭ জন।
এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান জয়ী হন। তিনি পান ৯৯ হাজার ২৪০ ভোট। বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান পান ৮৫ হাজার ১৭১ ভোট। সেবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ভোটার ছিল ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৭০ জন।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান আসনটি ফিরে পান। ৪ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৫ ভোটের মধ্যে নোমান পান ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৯ ভোট। আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান পান ১ লাখ ১১ হাজার ৯৩৫ ভোট। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তখন এটি ছিল চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসন। এই আসনে জিতেছিলেন আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম। তিনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৪১১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোহাম্মদ শামসুল আলম পান ১ লাখ ৯ হাজার ৪৮৪ ভোট।
দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক আছে। ভোটারদের বড় অংশ বলছেন, ওই নির্বাচনগুলো ছিল একতরফা ও প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে ওই সময় এই আসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরাই জয়ী হন।
ভোটারদের অনেকেই বলছেন, তাঁরা শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না। তাঁরা চান নিরাপদ শহর, নিয়মিত পানি, জলাবদ্ধতামুক্ত সড়ক, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, চাঁদাবাজিমুক্ত বাজার এবং সিআরবির মতো সবুজ জায়গা রক্ষার নিশ্চয়তা।
এবার মাঠে ১০ প্রার্থী
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এখন প্রচারের ব্যস্ত সময়। প্রার্থীরা অলিগলি ঘুরছেন, ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন, নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এই আসনে এবার প্রার্থী আছেন ১০ জন। ভোটারসংখ্যা ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৬৩। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৪৪৮ জন।
বিএনপি প্রার্থী করেছে আবু সুফিয়ানকে। তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক। জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রার্থী হয়েছেন এ কে এম ফজলুল হক। গণসংহতি আন্দোলন থেকে প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ। আরও আছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, নাগরিক ঐক্য, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এবং জনতার দলের প্রার্থীরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাঁদের কেউ আগে সংসদ সদস্য ছিলেন না। ভোটারদের ধারণা, মূল লড়াই হতে পারে বিএনপির আবু সুফিয়ান, জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম ফজলুল হক ও গণসংহতি আন্দোলনের সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফের মধ্যে।
নাগরিক ভোগান্তির তালিকা দীর্ঘ
এই আসনের অলিগলি ঘুরলে চোখে পড়ে আরেক চট্টগ্রাম, যেখানে উন্নয়নের পাশাপাশি আছে দৈনন্দিন ভোগান্তি। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকট আছে। ওয়াসা নিয়মিত পানি দিতে পারে না। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। নালাগুলো সরু, কোথাও কোথাও দখল হয়ে গেছে। ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে অলিগলিতে।
চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগও নতুন নয়। কোতোয়ালি, চকবাজার, খাতুনগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফুটপাতের দোকান, গণপরিবহন, এমনকি বাজারে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ আছে। চকবাজার এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, চাঁদাবাজি বড় সমস্যা। এটা বন্ধ করতে হবে।
নিউমার্কেট এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে। একজন মুঠোফোন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাস কিংবা রিকশায় বসে থাকলেও টান দিয়ে মোবাইল নিয়ে যায়। মানুষ আতঙ্কে থাকে। নতুন জনপ্রতিনিধিকে এসব অপরাধ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভোটারদের অনেকেই বলছেন, তাঁরা শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না। তাঁরা চান নিরাপদ শহর, নিয়মিত পানি, জলাবদ্ধতামুক্ত সড়ক, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, চাঁদাবাজিমুক্ত বাজার এবং সিআরবির মতো সবুজ জায়গা রক্ষার নিশ্চয়তা।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা
খাতুনগঞ্জকে ঘিরে চাক্তাই, আসাদগঞ্জ, কোরবানিগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা মিলিয়ে বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এখানে প্রায় পাঁচ হাজার আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে। ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি ইস্পাত, ঢেউটিন, রাসায়নিক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বড় বেচাকেনা হয়।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিঞা মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস নিজেও এই আসনের ভোটার। তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত আনতে হবে। শুল্ক কমাতে হবে। খাতুনগঞ্জে ঢোকা ট্রাক থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ আছে, এটা বন্ধ করতে হবে। সীতাকুণ্ডে ওজন স্কেল বসানোর দাবি দীর্ঘদিনের। নতুন সংসদ সদস্য যেন এটা দেখেন। তবে খাতুনগঞ্জ যেন রাজনীতিমুক্ত থাকে, সেটিও চাওয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসের। তিনি বলেন, সরকার আসবে, সরকার যাবে। টিকে থাকতে হবে খাতুনগঞ্জকে।
চাক্তাই শিল্প ও ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসান খালেদ বলেন, খাতুনগঞ্জ এত বড় এলাকা, অথচ গণশৌচাগার নেই। সড়কও ভালো নয়। নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেনের সঙ্গেও কথা হলো। তিনি বলেন, শহরের সবচেয়ে বড় ফলের আড়ত এই আসনে। ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেন, তাহলে ব্যবসা আরও স্বস্তিতে চলবে।