লাইব্রেরির পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা, শব্দার্থ, রচনা, টাইপিং ও বই পড়ার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়
লাইব্রেরির পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা, শব্দার্থ, রচনা, টাইপিং ও বই পড়ার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়

প্রত্যন্ত গ্রামের আলোকবর্তিকা সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরি

সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরি কেবল বই পড়ার স্থান নয়। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে নিয়মিত শিক্ষা উপকরণ, বই ও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। বৃক্ষরোপণ অভিযানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা, শব্দার্থ, রচনা, টাইপিং ও বই পড়ার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটে। 

পাবলিক লাইব্রেরিটির অবস্থান সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের সোয়ালিয়া গ্রামে। একটি ছোট ভবন আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো অঞ্চলে। ছোট ছেলে-মেয়েরা জীবনে নতুন আশা নিয়ে আসে সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরিতে।

সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর উপজেলা সদরের দূরত্ব ৫৮ কিলোমিটার। সেখান থেকে আরও ১৬ কিলোমিটার পেরিয়ে সোয়ালিয়া গ্রাম। আগে একসময় এখানকার ছয়টি গ্রাম মিলে ছিল ‘ছোটকুপট গ্রাম’। এ গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া খাল ছোটকুপট গ্রামটি দুই ভাগে বিভাক্ত করেছে। এক পাশে সোয়ালিয়া, বয়ারসিং ও সাপেরদুনে গ্রাম। অন্য পাশে যোগিন্দ্রনগর, ছোটকুপট ও হেঞ্চি গ্রাম। এসব গ্রামের অধিকাংশ পরিবার দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। তারা শিক্ষাও পিছিয়ে। 

সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা গ্রামের বাসিন্দা আবু সাঈদ। তিনি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্ল্যানিং অফিসার। গল্পে গল্পে শোনান লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার কথা। ২০১০ সালে ইউরোপিয়ান কমিশনের স্কলারশিপ নিয়ে ইতালিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন আবু সাঈদ। ওই সময় তিনি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁদের একটি ক্লাসে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা থেকে একজন অধ্যাপক এসেছিলেন ক্লাস নিতে। তাঁর ক্লাসে সাঈদ প্রথম লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ব্যক্ত করেন। ওই সময় অধ্যয়নরত ২২ দেশের ২৫ সহপাঠী সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। 

সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরিতে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সুযোগ পায় ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা

দেশে ফিরে আবু সাঈদ নিজ গ্রাম সোয়ালিয়ায় একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। পারিবারিক জমিতে ৩৬০ বর্গফুট জায়গার ওপর তিনতলা ভবনের ভিত্তি দিয়ে একতলা ভবন নির্মাণ করেন। লাইব্রেরি ভবনে দুর্যোগকালীন মানুষের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ২০১২ সালের ২০ মে সোয়ালিয়া পাবলিক  লাইব্রেরিটির ভিত্তি স্থাপন করা হয়। ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে লাইব্রেরিটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। লাইব্রেরিটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আবু সাঈদের বিদেশি বন্ধুরাও যোগ দিয়েছিলেন। 

বর্তমানে লাইব্রেরিতে দুজন বেতনভুক্ত খণ্ডকালীন সহকারী আছেন। লাইব্রেরিয়ান মোস্তফা হাসানুল বান্না ও কেয়ারটেকার রাফেজা খাতুন। লাইব্রেরিয়ান মোস্তফা হাসানুল রোমানিয়া থেকে লাইব্রেরি পরিচালনার ওপর এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি জানান, লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে দেশি-বিদেশি অন্তত ১ হাজার ৪০০ বই। যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও অনুপ্রেরণার উৎস। শিক্ষার্থীরা এখানে বসে পাঠ্যবই, সাধারণ জ্ঞান, প্রবন্ধ ও সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞানসম্ভার বৃদ্ধি করছে। লাইব্রেরির উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা—রচনা, শব্দার্থ, টাইপিং ও বই পড়া পরিচালিত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের কেবল পড়াশোনাতেই নয়, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব গঠনে সক্ষম হচ্ছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের সোয়ালিয়া গ্রামে লাইব্রেরিটির অবস্থান

আবু সাঈদ বলেন, ‘একটি লাইব্রেরি একটি সমাজ বদলাতে পারে—এ ধারণা থেকে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই। আমার আয়ের একটি অংশ পাঠাগারে খরচ করি। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে অনুদান পাই।’

শুধু শিক্ষাই নয়, লাইব্রেরিটি গ্রামীণ সমাজে সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধও বৃদ্ধি করছে। স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও গ্রামজুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো এবং তরুণদের জীবনে স্বপ্ন দেখার উদ্দীপনা তৈরি—সবকিছুতেই লাইব্রেরি ভূমিকা রাখছে।

যশোর মেডিকেল কলেজ থেকে সদ্য এমবিবিএস পাস করেছেন মাসুদুর রহমান। শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি গ্রামে তাঁর বাড়ি। তিনি জানান, পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে হঠাৎ করে লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু ঠিক সে সময় পাশে দাঁড়ায় সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরি। প্রতিষ্ঠানটির সহায়তায় তাঁর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। 

খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আবু সায়েদ মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম বলেন, তিনি সোয়ালিয়ায় লাইব্রেরিটিতে গিয়েছেন। অজপাড়াগাঁয়ে এমন একটি উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।