বৈশাখের কড়া রোদে ধানমাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত কৃষক আলী আকবর। আজ শুক্রবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাওন হাওরে
বৈশাখের কড়া রোদে ধানমাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত কৃষক আলী আকবর। আজ শুক্রবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাওন হাওরে

মানুষের কথা

‘কৃষিকাজ করি খালি বাঁইচ্যা থাকার লাগি, কোনো লাভ নাই’

হাওরে এবার ২০ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেন কৃষক আলী আকবর। তিন বিঘা জমির ধান কেটেছেন। একদিকে হাত খালি, অন্যদিকে শ্রমিকও পাওয়া যায় না। তাই ১৩ বছর বয়সী ছেলে রেদোয়ানকে নিয়েই জমির ধান কাটতে নেমেছেন।

আজ শুক্রবার দুপুরে বৈশাখের কড়া রোদে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাওন হাওরে দেখা আলী আকবরের সঙ্গে। আরও দুই কৃষকের সঙ্গে হাওর থেকে ধান কেটে এনে মাড়াই করার জন্য খলায় রাখছিলেন তিনি। কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব দিক থাকি চাপও আছি আমরা। কৃষিকাজ করি খালি বাঁইচ্যা থাকার লাগি। কোনো লাভ নাই। ধানের দাম আর খরচ ত সমান সমান। সবতার দাম বেশি। এখন সংসার চালানোই দায়।’

হাওরপারের হাছনবাহার গ্রামে বাড়ি এই বর্গাচাষি হিসাব কষে বলেন, এখন এক বিঘা জমি আবাদ করতে শ্রমিক, সার, বীজ ও কীটনাশক মিলিয়ে খরচ পড়ে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। এরপর এক বিঘা জমির ধান কাটাতে শ্রমিক লাগে চারজন। এবার শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এরপর আছে মেশিনে মাড়াই। এক বিঘায় ধান হয় ১২ থেকে ১৪ মণ। সব খরচ বাদে ধান যা থাকে, তাতে কোনোরকমে চলতে হয়।

কথায় কথায় আলী আকবর বলছিলেন, ডিজেলের দাম বেশি। এ কারণে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে মেশিনের খরচ এবার বাড়তি দিতে হচ্ছে। ধানকাটা শ্রমিক নেই, এটা আরেক সমস্যা।

স্ত্রী ও চার ছেলেকে নিয়ে ছয় সদস্যের পরিবার আলী আকবরের। ১৩ বছর বয়সী বড় ছেলে রেদোয়ানকে সংসারের টানাপোড়েনের কারণে সপ্তম শ্রেণির পর আর স্কুলে পাঠাতে পারেননি। বর্গাচাষ করে যা ধান পান, তা দিয়ে পুরো বছর চলে না। এখন দ্রব্যের দাম বাড়ার কারণে সংকট আরও বেড়েছে।

হাওর থেকে কেটে আনা ধান খলায় মেশিন দিয়ে মাড়াই করা হচ্ছে। আজ দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাওন হাওরে

বাজারে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে আলী আকবর বলেন, ‘সয়াবিন ২০০ টাকা, আলু ৩০ টাকা। কোনো আনাজ (সবজি) ৭০–৮০ টাকার নিচে নাই। যুদ্ধের কারণে নাকি দেশে তেল আনা যাচ্ছে না। মাল টানার গাড়িভাড়া বেশি। এর লাগি সবতার দাম বাড়ছে। কিন্তু আমরা ত ধানের ন্যায্য দাম পাই না।’

চৈত্রে হাওর এলাকায় অনেকের ঘরে চাল থাকে না। আগের মতো ‘চৈত্রের নিদান’ না থাকলেও এ সময়ে অনেকের ঘরে সংকট থাকে। জমি আবাদ করার সময়ে ধারদেনা করলে সেটি পরিশোধ করতে হয় বৈশাখের ধান কাটা শুরু হলে। আলী আকবর জানালেন, এ সময় অনেকে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। একে তো নিজের চলা, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ করার তাগাদা থাকে। এখন মাঠে ৮০০ টাকা মণ ধান বিক্রি হচ্ছে। বৈশাখের শেষ দিকে দাম বাড়বে। কিন্তু কৃষকেরা ত বাধ্য হয়ে কম দামে এখন ধান বিক্রি করছেন।

কথা বলতে বলতেই হাওরের খলায় ধানমাড়াইয়ের মেশিন নিয়ে আসেন এলাকার যুবক শাহীন মিয়া (৩৫)। ব্যস্ত হয়ে পড়েন আলী আকবর ও তাঁর ছেলে রেদোয়ান। শাহীন মিয়ার কাছে জানতে চাই, মেশিন চালানোর ডিজেল প্রসঙ্গে। এক ঘণ্টা ধানমাড়াইয়ের মেশিন চালাতে তাঁর দুই লিটার ডিজেল দরকার হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শহরের একটি পাম্পে গিয়ে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর কৃষি কার্ড দেখিয়ে ১৫ লিটার ডিজেল এনেছেন। এ জন্য ওই পাম্পের এক কর্মীকে ৫০ টাকা বকশিশ দিতে হয়েছে। শাহীন বলছিলেন, ডিজেলের অভাবে টানা মেশিন চালানো যায় না। আবার সহজে ডিজেলও পাওয়া যায় না। তাই এবার মেশিন চালিয়ে খুব একটা লাভ হচ্ছে না বলে জানালেন তিনি।

আলী আকবরের সঙ্গে কথা বলার সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন এলাকার কৃষক আবদুল মছব্বির (৬০) ও নূর আহমদ (৩৮)। মছব্বির বলছিলেন, ‘যুদ্ধ লাগছে অন্য দেশও, আর আমরার ওপরেদি বিপদ যার। কারেন্ট নাই, ডিজেল নাই। আমরা কিতা করতাম। একটা কুনতা কিনতে গেলেই দাম বেশি। সামনের দিন ত মনে অয় আরও খারাপ অইবো।’