
‘আমাদের পাঁচ ভাইয়ের দুই মেয়ে। সবার প্রিয় আয়েশা চলে গেল। নিজ হাতে কবরে নামিয়েছি। কী যে কষ্ট, তা বলে বোঝাতে পারব না।’ আবেগাপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন আয়েশা সিদ্দীকার (১৩) চাচা নাসির উদ্দীন।
আয়েশা গত বুধবার বিকেলে মা–বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে করে ঢাকায় যাচ্ছিল। গোয়ালন্দে ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে যায়। এতে আয়েশাসহ অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নদী থেকে বাস তোলার পর পন্টুনের নিচে তল্লাশি চালিয়ে আয়েশার মরদেহ উদ্ধার করেন ডুবুরিরা। গতকাল বৃহস্পতিবার কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শোমসপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে লাশ নেওয়ার পর জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়।
আয়েশার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আয়েশার বাবার নাম গিয়াস উদ্দীন। গিয়াস ও তাঁর ভাই নাসির মিলে ঢাকার ধামরাইয়ে একটি ব্যবসা পরিচালনা করেন। ঈদের ছুটিতে তাঁরা বাড়িতে এসেছিলেন। বুধবার দুপুরে খোকসা থেকে গিয়াস, তাঁর স্ত্রী লিটা খাতুন, ছেলে আবুল কাশেম ওরফে সাফিন ও আয়েশা সিদ্দীকা সৌহার্দ্য পরিবহনে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।
আয়েশার বাবা গিয়াস উদ্দীন বলেন, পাঁচটার দিকে ফেরিঘাটে বাসটি ফেরির অপেক্ষায় ঢালে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় নামাজ পড়ার জন্য ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিচে নামেন। বাসের ভেতরে স্ত্রী ও মেয়ে বসে ছিল। কিছুক্ষণ পর দেখতে পান বাসটি দ্রুতগতিতে সামনে দিকে চলে যাচ্ছে। পেছন পেছন দৌড়ে যেতেই বাসটি পানিতে পড়ে যায়। নিচে তাকিয়ে থাকার দুই–এক মিনিট পর কয়েকজনকে ভাসতে দেখেন। তাঁদের মধ্যে স্ত্রী লিটা খাতুনও ছিলেন। স্থানীয়দের সহায়তায় স্ত্রীকে উদ্ধার করেন।
গিয়াস উদ্দিন আরও বলেন, মেয়ের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় সময় পার করতে থাকেন। বাড়িতে খবর দেওয়ার পর পরিবারের অন্য সদস্যরা ফেরিঘাটে চলে আসেন। রাত ১২টার দিকে বাস উদ্ধার হলেও আয়েশার সন্ধান মিলছিল না। এরপর রাত তিনটার দিকে পন্টুনের নিচে তল্লাশি চালিয়ে ডুবুরিরা সাতটি মরদেহ উদ্ধার করেন। তাঁদের মধ্যে আয়েশার লাশ পাওয়া যায়। এরপর রাতেই লাশ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে চলে আসেন। গতকাল সকাল ৯টায় লাশ দাফন করা হয়।
শোমসপুর গ্রামে আয়েশা সিদ্দীকার মরদেহ পৌঁছালে সেখানে মানুষের ঢল নামে। আয়েশা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। এরপর মাদ্রাসায় হিফজ পড়ছে। ১৮ পারা চলমান ছিল তার। গিয়াস উদ্দীন বলেন, ‘নিজের চোখের সামনে মেয়ে ও স্ত্রীকে ডুবে যেতে দেখেছি। একপর্যায়ে স্ত্রী ভেসে উঠলেও মেয়েকে আর উদ্ধার করতে পারিনি। দুর্ঘটনার মুহূর্তটা চোখের সামনে ভাসছে।’
আয়েশার মা লিটা খাতুন বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কারও সঙ্গে তেমন কথা বলছেন না। মেয়েকে হারিয়ে কাতর হয়ে পড়েছেন তিনি। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কীভাবে তিনি ভেসে উঠেছেন, কিছুই মনে নেই তাঁর।
আয়েশার চাচা নাসির উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, শুক্রবার জুমার নামাজের পর পারিবারিকভাবে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি ঢাকায় ফিরে যাচ্ছেন। কয়েক দিনের মধ্যে ভাই গিয়াসও পরিবার নিয়ে আবার ঢাকায় রওনা দেবেন। তবে মেয়েকে হারিয়ে পরিবারের সব সদস্য খুবই শোকের মধ্যে আছেন।