
ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি বাজার। বাজার থেকে ১০০ গজ পার হলেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পৈতৃক বাড়ি। ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসন থেকে এবার বিএনপির প্রার্থী হয়ে তিনি সংসদ নির্বাচন করছেন। একসময় শিক্ষকতার কারণে এলাকার ছোট-বড় সবার ‘স্যার’ তিনি। এ কারণে জয়ের বিষয়ে অনেকটা নির্ভার হলেও প্রচার–প্রচারণায় কোনো ঘাটতি রাখছেন না মির্জা ফখরুল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির এই নেতা। ছুটে চলছেন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। এটাই নিজের শেষ নির্বাচন জানিয়ে ভোটারদের তাঁর পাশে থাকতে আহ্বান জানাচ্ছেন। পাশাপাশি দিয়ে যাচ্ছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি।
আজ বুধবার সকাল সাড়ে নয়টা। মির্জা ফখরুলের বাড়ির সামনে নেতা-কর্মীসহ নানা পেশা, ধর্মের মানুষের জটলা দেখা যায়। বসার ঘরে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন তিনি। তাঁদের কাছ থেকে নির্বাচনী প্রচারণার খবর নিচ্ছেন, কাউকে দিচ্ছেন দিকনির্দেশনা। সে সময় সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন বলেন, প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্যার। শবে বরাতের কারণে গণসংযোগে গতকাল মঙ্গলবার বিরতি থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের পাশে ছিলেন তিনি, নিয়েছেন প্রচারণার খোঁজখবর।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, ‘দলের মহাসচিব আমাদের অভিভাবক। তিনি গ্রামের পাড়া–মহল্লায় ছুটে গিয়ে মানুষের কথা শুনছেন। গ্রামের মানুষেরাও তাঁকে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করছেন। আর দলের সব পর্যায়ের নেতা–কর্মী, সমর্থকেরা নিজ নিজ এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে বাবার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন মহাসচিবের মেয়ে শামারুহ মির্জা।’
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বের হয়ে পড়লেন মির্জা ফখরুল। উদ্দেশ্য সদরের নারগুন ইউনিয়নের কিসমত দৌলতপুর। কিন্তু পথে নেমে পড়লেন ধানের শীষের পোলিং এজেন্টদের একটি প্রশিক্ষণে। সেখানে তিনি, পোলিং এজেন্টদের ফলাফল নিয়ে বাড়িতে ফিরতে নির্দেশনা দেন। এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েন গণসংযোগে। পথে যেতে যেতে গ্রামবাসী তাঁর দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। তিনিও হাত তুলে তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। আবার কোথাও জটলা দেখে গাড়ি থেকে নেমে মানুষজনের সঙ্গে করেন কুশল বিনিময়।
বেলা সাড়ে ১১টায় কিসমত দৌলতপুর পৌঁছালে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিএনপির মহাসচিবকে স্বাগত জানান। কেউ কেউ ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেন তাঁকে। মির্জা ফখরুলও হাত তুলে তাঁদের ভালোবাসার জবাব দেন। নির্বাচনী সভায় তিনি বলেন, ‘আমি নতুন কোনো মানুষ নই। প্রায় ৩৫ বছর ধরে আপনাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। শিক্ষকতার কারণে এলাকার ছোট-বড় সবাই আমাকে স্যার বলে ডাকেন। এখানে অনেকেই আমার ছাত্র। নির্বাচনে আমি কখনো জিতেছি, আবার কখনো হেরেছি। কিন্তু আপনাদের ছেড়ে যাইনি। আপনারাও সব সময় আমার পাশে ছিলেন।’
এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে ভোট চাইতে এসেছি, খালি হাতে আসি নাই। সরকার গঠন করলে এলাকায় একটা মেডিক্যাল কলেজ, একটা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলব। বন্ধ বিমানবন্দর চালু করব। আমাদের ভাই-বোনদের কারিগরি বিষয়ে পড়ালেখার সুযোগ করে দেব। ডাটা প্রসেসিংয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। বেকারদের চাকরির জন্য কলকারখানা গড়ে তুলব। আর হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি তৈরি করে ঠাকুরগাঁওকে একটা মডেল অঞ্চলে পরিণত করব।’
পথসভা শেষে মির্জা ফখরুল উপস্থিত ভোটারদের সঙ্গে হাত মেলান, কাউকে কাউকে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করেন।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মির্জা ফখরুল পাশের বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের বশভাংগা গ্রামে পৌঁছালে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটাররা তাঁকে ফুল ও উলুধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানান। পরে সেখানে মতবিনিময় সভায় তিনি কথা বলেন। এটাই তাঁর জীবনের শেষ নির্বাচন জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। ভোট দিয়ে ফিরে আসবেন। আপনাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের। যত দিন আমি আছি, তত দিন আপনাদের কেউ কিছু করতে পারবে না।’
এ সময় মির্জা ফখরুল জানান, বিএনপি সরকার গঠন করলে ছয় মাসের মধ্যে বশভাংগা মন্দিরের উন্নয়নসহ এলাকার রাস্তা পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আগামী শনিবার বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঠাকুরগাঁও বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে এক জনসভায় বক্তব্য দেবেন, এই বার্তা দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সেই জনসভায় আমি আপনাদের দাওয়াত দিলাম। সবাই দল বেঁধে সেখানে যাবেন।’
সোয়া একটার দিকে বশভাংগা থেকে শহরের দিকে রওনা হন মির্জা ফখরুল। পথে দানারহাট, কহরপাড়া, মন্ডলপাড়াসহ কয়েকটি জায়গায় জড়ো হওয়া ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। মন্ডলপাড়ায় মোছা. চামেলি নামের এক নারী ভোটার তাঁকে মাটির ব্যাংকভর্তি টাকা উপহার দেন। এ ছাড়া আজ তিনি রাজাগাঁও ইউনিয়নের মুন্সিমার্কেট, বাদিয়া মার্কেট, পাটিয়াডাঙ্গী হাইস্কুল, সালন্দর ইউনিয়নের স্কুলের হাটসহ সাতটি পথসভায় বক্তব্য দেন। সেখান থেকে ফিরে এসে সন্ধ্যা সাতটায় ঠাকুরগাঁও পৌরসভার গোয়ালপাড়ায় এক পথসভায় যোগ দেন তিনি। রাত সাড়ে আটটায় ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। রাত সাড়ে নয়টায় শহরের মির্জা রুহুল আমিন পৌর মিলনায়তনে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুলের দিনের কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা।
বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবুল ইসলাম বলেন, এখানে মানুষের প্রধান পেশাই হলো কৃষিকাজ। তবে কৃষক ফসল ফলিয়ে বছরের পর বছর ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এখানে একটি চিনিকল আর কয়েকটি অটো রাইস মিল ছাড়া কোনো শিল্প, কলকারখানা নেই। বিএনপির মহাসচিব জয়ী হলে তিনি এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবেন।
পায়ে সমস্যার কারণে লাঠির ওপর ভর করে চলতে হয় নারগুন ইউনিয়নের মন্ডলপাড়া গ্রামের জুলেখা বেগমকে। তিনিও মির্জা ফখরুলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। জুলেখা বলেন, ‘স্যার (মির্জা ফখরুল) একখান বড় দলের বড় নেতা। তিনি জিতিলে এলাকাত অনেক কাজ করবা পারিবেন।’ আর কিসমত দৌলতপুরের ভোটার সালেহা বেগম বলেন, ‘একখান ভালো মানুষক ভোট দিয়া জিতাবা পারিলে হামারই লাভ।’
বেগুনবাড়িতে সভা শেষে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন রাজনীতি করে আসছি। এ এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এলাকার লোকজন সবাই আমাকে ভালোবেসে স্যার বলে সম্বোধন করেন। তাঁদের সমস্যাগুলো কী, তা আমি জানি। গণসংযোগে গিয়ে আমরা তাঁদের প্রত্যাশার কথা শুনছি। এই নির্বাচনে আমাদের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারব।’