জুতা রং করছেন লিটন চন্দ্র দাস। গত শনিবার সকালে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার অগ্রণী ব্যাংক রোড এলাকায়
জুতা রং করছেন লিটন চন্দ্র দাস। গত শনিবার সকালে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার অগ্রণী ব্যাংক রোড এলাকায়

মানুষের কথা

‘রুজির টেয়ায় খাওনই জোটে না, মায়ের ওষুধ কিনি ক্যামনে’

‘জুতা সেলাই ও কালি কইরা (মুচিগিরি) দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ টেয়া রুজি অয়। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি। এর ওপর অসুস্থ ও বৃদ্ধ মার ওষুধ কিনতেই খরচ মাসে দুই হাজার টেয়া। রুজির টেয়ায় দুই বেলা খাওনই জোটে না। মায়ের ওষুধ কিনি ক্যামনে।’ এ কথা বলছিলেন লিটন চন্দ্র দাস (৪০)।

লিটনের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার শীলমন্দি এলাকায়। তিনি ২৮ বছর ধরে উপজেলা সদর ও আশপাশের এলাকায় হেঁটে ও ফুটপাতে বসে জুতা সেলাই ও কালি করে জীবিকা চালাচ্ছেন। তিনি শীলমন্দি এলাকার মৃত মাখন চন্দ্র দাসের ছেলে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে লিটন সবার ছোট। অসুস্থ মা, স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার।

গত শনিবার সকাল ১০টায় উপজেলা সদরের কলেজ রোড এলাকার ফুটপাতে বসে একজনের জুতা কালি (রং) করছিলেন লিটন চন্দ্র দাস। সেখানে কাজের ফাঁকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর বাবাও মুচির কাজ করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর তিনিসহ তাঁর দুই ভাই বাবার পথ ধরে এ পেশায় আসেন। বোনদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। দুই ভাই আলাদা সংসার পেতেছেন। মা ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত। স্ত্রী এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার।

লিটন চন্দ্র দাস বলেন, ১৯৯৭ সালে ১২ বছর বয়সে এ পেশায় আসেন। প্রতিদিন সকালে কাজে নামেন, টানা রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করে ফেরেন বাড়ি। প্রতিদিন গড়ে আয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, তবে কোনো কোনো দিন ৩৭৫ টাকাও হয়।

লিটন চন্দ্র দাস আরও বলেন, ঝড়-বৃষ্টি থাকলে ফুটপাতে বসে ও হেঁটে জুতা রং ও সেলাইয়ের কাজ করতে পারেন না। শরীর অসুস্থ থাকলেও মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধ থাকে। মাসে গড়ে কাজ করেন ২০ থেকে ২২ দিন। ওই ২০-২২ দিনে আয় করেন ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। অসুস্থ মায়ের ওষুধ কিনতে মাসে খরচ দুই হাজার টাকা। বাকি টাকায় সংসার চলে না। প্রতি মাসে টাকা ধার করতে হয়। অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হয়। ছেলেমেয়েকেও পড়াতে পারছেন না। আর্থিক সমস্যায় একমাত্র ছেলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে আর পড়েনি।

১৯৯৭ সালে ১২ বছর বয়সে লিটন চন্দ্র দাস এ পেশায় আসেন। প্রতিদিন সকালে কাজে নামেন, টানা রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করে ফেরেন বাড়ি। প্রতিদিন গড়ে আয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, তবে কোনো কোনো দিন ৩৭৫ টাকাও হয়।

‘বাজারে কাঁচা তরকারি, সয়াবিন তেল, ডিম, চাল, মাছ, মাংসসহ সব জিনিসের দামই এহন চড়া। দোকানে বাকিবকা রাইখা জিনিসপত্র কিনি। মাসের শেষে বাকি শোধ দিয়া আবার বাকিতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (ভোগ্যপণ্য) কিনি। তবে হগল জিনিস বাকিতে পাওয়া যায় না। দোকানিরাও ক্যামন যেন অইয়া গেছে’—হতাশার ভঙ্গিতে কথাগুলো উচ্চারণ করেন লিটন চন্দ্র দাস।

উপজেলার কলাদী এলাকার বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি লিটনকে ভালোভাবেই চেনেন। তিনি রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল-সন্ধ্যা জুতা সেলাই, পলিশ ও রঙের কাজ করেন মনোযোগ দিয়ে। কারও কাছ থেকে পাওনার এক টাকাও বেশি নেন না। তাঁর কাজ সুন্দর। তিনি খেটে খাওয়া মানুষের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।