দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে

দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ নিহত ১৪

দুই মেয়ের সঙ্গে মা-শাশুড়িকে হারিয়েছেন আবদুস সালাম

মর্গের সামনে ভিড়। কেউ কাঁদছেন, কেউ ফোনে স্বজনদের খবর দিচ্ছেন, কেউ আবার স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। চারদিকে কান্না আর আহাজারি। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে যেন শোকের ভারে থমকে গেছে সময়।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটায় এই ভিড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়ল। চোখে অশ্রু, মুখে অসহায় নীরবতা। এক দিনেই তিনি হারিয়েছেন তাঁর দুই মেয়ে, মা ও শাশুড়িকে।
ক্ষীণ ও জড়ানো কণ্ঠে আবদুস সালাম বলছিলেন, ‘গাড়িতে আমার দুই মেয়ে ছিল, আমার জামাই ছিল…আমার বড় মেয়েটার গতকাল (বুধবার) বিয়ে হয়েছে। ওর নাম মার্জিয়া…আর ছোটটার নাম…।’ কথা শেষ করতে পারছিলেন না তিনি। একটু থেমে মাথা নেড়ে আবার বললেন, ‘ছোট মেয়েটার নাম লামিয়া।’

বুধবার রাতে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) বিয়ে হয়। তাঁর শ্বশুরবাড়ি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়ায়। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বরপক্ষ মাইক্রোবাসে করে নববধূকে নিয়ে মোংলার উদ্দেশে রওনা হয়। বিকেলে দুর্ঘটনার খবর পান আবদুস সালাম। চারটার দিকে রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় খুলনা-মোংলা মহাসড়কে ওই মাইক্রোবাসের সঙ্গে নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের আরোহী বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ওই দুর্ঘটনায় মার্জিয়া আক্তার, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম নিহত হয়েছেন। মিতু নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

মার্জিয়া আক্তারের মামা আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, কয়রার নাকসা গ্রামে বুধবার রাতে মার্জিয়ার বিয়ে হয়। বৃহস্পতিবার নববধূকে নিয়ে বরযাত্রীদের মাইক্রোবাসটি মোংলার শেলাবুনিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। রামপালের কাছে পৌঁছালে দুর্ঘটনা ঘটে।

মর্গের অদূরে একটি খোলা জায়গায় হঠাৎ মূর্ছা যান আবদুস সালাম। স্বজনেরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। কেউ হাত–পা টিপে দিচ্ছেন, কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সান্ত্বনার যেন কোনো ভাষাই খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। একপর্যায়ে তাঁকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন মাইক্রোবাসের চালক নাঈম। তাঁর বোনও মর্গের সামনে আহাজারি করছিলেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মেহেনাজ মোশাররফ বলেন, সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত হাসপাতালে আটজনের মরদেহ এসেছে। এর মধ্যে তিনজন শিশু, তিনজন নারী ও দুজন পুরুষ। গুরুতর আহত অবস্থায় ভর্তি একজন পরে মারা গেছেন।

পরে রাতে বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার ওসি জাফর আহমেদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মাইক্রোবাসটিতে চালকসহ ১৫ জন ছিলেন। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ১৪ জন মারা গেছেন। আর একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।