‘আমাগো দেহার মতো মানুষ নাই’

তারা মিয়া–ছালেহা খাতুন দম্পতি
ছবি: প্রথম আলো

ভোরের আকাশ ভেদ করে উঁকি দিয়েছে সূর্য। অনাবাদি জমির আইলে গজানো কলমি ও মালঞ্চশাক তুলছিলেন ৬০ বছরের কাছাকাছি বয়সের ছালেহা খাতুন। কিছুক্ষণ পরপর পরনের শাড়ির আঁচলে রাখছিলেন সেসব শাক। অনেকটা সময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে শাক তুলে যখন পাশের গ্রামে বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন, তখন মেঘে ঢাকা পড়ে যায় সূর্য। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজেই হাঁটা শুরু করলেন তিনি।

গতকাল বুধবার সকালে এই দৃশ্য দেখা গেল মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘী গ্রামে। এক সড়ক দুর্ঘটনায় রিকশাচালক স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর থেকে শাক, লতাপাতা ও কচুর লতি বিক্রি করে চলছে ছালেহার সংসার। ছালেহার বাড়ি দিঘী দক্ষিণপাড়া গ্রামে। স্বামী তারা মিয়া (৬১) রিকশা চালাতেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাকের ধাক্কায় রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে তারা মিয়া মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হলেও কাজ আর করতে পারেন না তিনি।

বৃদ্ধ এই দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগে। একমাত্র ছেলে বাদল মিয়া প্রাইভেট কার চালাতেন। তবে মালিক গাড়ি বিক্রি করায় ছেলে চাকরি হারান। এখন মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে একটা কাজ করছেন। স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে ছেলের সংসার। ছেলের যে উপার্জন, তা দিয়ে তাঁরই চলতে কষ্ট হয়। মা–বাবাকে তেমন সহায়তা করতে পারেন না।

বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলে ও তাঁদের ভিন্ন সংসার। এক টুকরা বসতবাড়ি ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই। থাকার ঘরটা জরাজীর্ণ। তারা মিয়া বলেন, ‘আমার তো শরীর চলে না। কামাই-রোজগারও নাই। আমাগো দেহার মতো মানুষ নাই।’

ছালেহা বেগমের ভাষ্য, ধান কাটার পর জমির মালিক বাড়িতে ধান নিয়ে গেলে খেতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা ধান কুড়ান তিনি। রাস্তার পাশে কচুর লতি, শাক ও লতাপাতা কুড়িয়ে বিক্রি করে যা পান, তাই দিয়েই চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম!

এ ব্যাপারে স্থানীয় দিঘী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আকতার উদ্দিন আহমেদ বলেন, খাদ্যসহায়তাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কোনো নতুন তালিকা হলে ওই দম্পতির একজনের নাম তালিকাভুক্ত করা হবে।

বৃদ্ধ দম্পতির কথা জানালে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আবদুল লতিফ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।