চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চবি ও চুয়েট

ভোট দিতে শিক্ষার্থীরা ছুটছেন বাড়ির পথে

‘এই প্রথম ভোট দেব। বিষয়টা ভাবলেই ভালো লাগছে। তাই আগেভাগেই বাড়ি চলে এসেছি। আশা করছি, পরিস্থিতি শান্ত থাকবে, উৎসবমুখর হবে।’ কথাগুলো বলছিলেন সাদিয়া আক্তার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তিনি। থাকেন ক্যাম্পাসের একটি হলে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে গত বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাস থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ শ কিলোমিটার দূরের গাইবান্ধার বাড়ির পথে রওনা হন সাদিয়া। বাড়িতে পৌঁছার পর মুঠোফোনে নির্বাচনের বিষয়ে এসব কথা বলে তিনি।

শুধু সাদিয়া নন, ভোট দিতে তাঁর মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী এখন বাড়ির পথে। কারও গন্তব্য টেকনাফ, কারও রংপুর। কেউ ছুটছেন সুনামগঞ্জে, কেউ যশোরে। কেউ কেউ ইতিমধ্যে বাড়িতে পৌঁছেছেন, কেউ আবার আজ মঙ্গলবার যাত্রা করবেন। দীর্ঘ পথ আর যাতায়াতের ঝামেলা সত্ত্বেও তাঁদের প্রত্যাশা একটাই, নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়া। তবে নির্বাচন-পরবর্তী পরীক্ষা, আর্থিক সংকট ও ভ্রমণ ব্যয়ের কারণে কেউ কেউ ভোট দিতে যেতে পারছেন না বলেও জানিয়েছেন।

এলাকায় ফিরেই নির্বাচনী আমেজ চোখে পড়ছে। প্রার্থীরা অলিগলি ঘুরছেন, নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বন্ধুরা মিলে ভোট দিতে যাব।
অমিত হাসান, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকার বাসিন্দা আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সারা মেহজাবিন ভোট দিতে আগেই বাড়ি পৌঁছেছেন। তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে হওয়া রাজনৈতিক আলোচনা আমাকে ভোট দিতে আগ্রহী করে তুলেছে। এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি দেশে শৃঙ্খলা ফেরাবেন, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যাবেন।’

উত্তরের জেলা নীলফামারীর পথে থাকা আবদুর রাশীদের কণ্ঠেও উচ্ছ্বাস। গত রোববার গাড়িতে বসেই তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ঘোষণা আসার পর থেকেই মনটা অন্য রকম। পরিবারের সঙ্গে প্রথমবার ভোট দেওয়ার ভাবনাটা খুব নাড়া দিচ্ছে।’ তাঁর প্রত্যাশা, ভোটের মাধ্যমে এমন একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন, যিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবেন এবং দেশের স্বার্থেই রাজনীতি করবেন।

খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ জেলার বাসিন্দা ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অমিত হাসানও বাড়ি ফিরেছেন ভোট দিতে। তিনি বলেন, ‘এলাকায় ফিরেই নির্বাচনী আমেজ চোখে পড়ছে। প্রার্থীরা অলিগলি ঘুরছেন, নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বন্ধুরা মিলে ভোট দিতে যাব।’

নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ১০ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অধিভুক্ত কলেজগুলোর সব পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরে জানানো হবে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ২৭ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ছাত্র, ১১ হাজার ছাত্রী এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী রয়েছেন। সহ-উপাচার্য (প্রশাসনিক) মো. কামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাক। শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।’

গতকাল ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটাই ফাঁকা। শহীদ মিনার থেকে গোলচত্বর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আনাগোনা ছিল কম। অনুষদ ভবনের পাশে গড়ে ওঠা ঝুপড়িগুলোও ছিল খানিকটা নিষ্প্রাণ।

চুয়েটেও একই ছবি, ভিন্ন প্রত্যাশা

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ক্যাম্পাসেও এখন নীরবতা। ক্লাসরুমে নেই ব্যস্ততার গুঞ্জন, ক্যাফেটেরিয়ার চেয়ারগুলো ফাঁকা। মূল ফটকের সামনে হাতে ট্রলিব্যাগ আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে। কেউ ছুটছেন রেলস্টেশনের দিকে, কেউ ধরবেন দূরপাল্লার বাস। গন্তব্য আলাদা হলেও উদ্দেশ্য একটাই—বাড়ি ফেরা, ভোট দেওয়া। গত রোববার এমন দৃশ্যই দেখা গেছে ক্যাম্পাসে।

ইলেকট্রনিকস ও টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী নাহিয়ান রশিদ ঢাকা-৬ আসনের ভোটার। বাড়ি যাওয়ার আগে ভোট নিয়ে কথা বলেন তিনি। নাহিয়ান চান এমন বাংলাদেশ, যেখানে কোনো ধরনের মাফিয়াতন্ত্র বা ক্ষমতার অপব্যবহার থাকবে না। তাঁর মতে, সম্প্রতি মব সহিংসতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই সহিংসতা মানুষের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই নতুন সরকার গঠনের দিন থেকেই মব সহিংসতা বন্ধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেও জরুরি পরিকল্পনা হিসেবে দেখেন তিনি।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ভোটার তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের ছাত্রী ফারিয়া আনোয়ারা বলেন, তাঁর এলাকার বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে ভাবায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে হওয়ায় অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কৃষিপ্রধান এলাকায় কৃষকেরা সময়মতো সার ও সেচসুবিধা পান না। বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা ও সুপেয় পানির সংকট নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে তিনি মনে করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের করুণ অবস্থা। চিকিৎসক ও জনবলের ঘাটতিতে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্ত্রাসের ভয়।

কিশোরগঞ্জ-১ আসনের ভোটার স্থাপত্য বিভাগের ছাত্রী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ঐতিহ্যবাহী হলেও আধুনিক নাগরিক সুবিধার দিক থেকে তাঁর এলাকা বৈষম্যের শিকার। ড্রেনেজ ব্যবস্থা বেহাল। শহরের অলিগলি নোংরা পানিতে ডুবে যায়। নরসুন্দা নদী দখল ও দূষণে কার্যত মৃতপ্রায়। তিনি চান এমন সরকার ও প্রতিনিধি, যারা দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের কথা ভাববে।

ময়মনসিংহ-৪ আসনের ভোটার পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম নুজহাত বলেন, তাঁর এলাকার মানুষ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট ও জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। উন্নয়নের কথা ব্যানার-ফেস্টুনে শোনা গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম। তিনি চান এমন নেতৃত্ব, যারা কথা নয়, কাজে বিশ্বাস করবে।