বিশ্বকবির ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার। মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামের সঙ্গে রয়েছে তাঁর অসংখ্য স্মৃতি।

উৎসর্গ কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘বেড়ার ওপারে মৌসুমি ফুলে রঙের স্বপ্ন বোনা, চেয়ে দেখে দেখে জানালার নাম রেখেছি- ‘‘নেত্রকোণা’’।’ তবে রবীন্দ্রনাথ কোনোদিন নেত্রকোনায় আসনেনি বলে জানালেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক যতীন সরকার। নেত্রকোনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মাধ্যমে।
বিশ্বকবির ঘনিষ্ঠ সহচর শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন নেত্রকোনার সন্তান। হাওর উপজেলা মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামের সঙ্গে শৈলজারঞ্জনের অসংখ্য স্মৃতি। তাঁর সেই স্মৃতি রক্ষায় গ্রামটিতে হচ্ছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ২ দশমিক ২০ একর জায়গার ওপর নির্মাণাধীন এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে থাকবে তিন তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবন, মিলনায়তন, শৈলজারঞ্জন মজুমদারের স্মৃতিচিহ্ন ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে একটি জাদুঘর, গ্রন্থাগার, পুকুরসহ বিশাল সবুজ চত্বর। এ ছাড়া মূল প্রাঙ্গণে থাকছে আধুনিক সুবিধা-সংবলিত ‘মেলা কিয়স্ক’, মুক্তমঞ্চ ও দৃষ্টিনন্দন হাঁটার রাস্তা।
প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত জেলার সংস্কৃতিকর্মীরা। শিক্ষাবিদ যতীন সরকার বলছিলেন, ‘শৈলজারঞ্জনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে নেত্রকোনার পরিচয় হওয়ার বিষয়টি আমরা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি। এখন শৈলজারঞ্জনের বাড়িতে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হওয়ায় তাঁর স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাবে বলে আমরা আশা করি।’
শৈলজারঞ্জন মজুমদার রবীন্দ্রসংগীতের খ্যাতিমান ওস্তাদ ছিলেন। বাহাম গ্রামে তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯০০ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের বেশির ভাগ সময় তাঁর কেটেছে কলকাতায়। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই শর বেশি গান ও বেশ কিছু গীতিনাট্যের স্বরলিপি প্রণয়ন করেছেন। বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রসংগীতকে বিশ্বদরবারে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ ভূমিকা আছে। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রসংগীতের সুর ও বাণীর প্রচার এবং বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন শৈলজারঞ্জন। এ জন্য তাঁকে ‘রবীন্দ্রসংগীতাচার্য’ও বলা হয়। তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘গীতাম্বুধি’ উপাধি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া কর্ম ও প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ উপাধি দেওয়া হয়। ২৪ মে ১৯৯২ সালে কলকাতার সল্টলেকে মৃত্যু হয় এই সংগীত অনুরাগীর।
মৃত্যুর প্রায় দুই যুগ পর শৈলাজারঞ্জনের স্মৃতিরক্ষা, রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও গবেষণার লক্ষ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি। ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত বিভাগ। প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯৮ শতাংশ শেষ বলে জানান নেত্রকোনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসিনুর রহমান। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে প্রকল্পটি হস্তান্তর করার আশা করছেন তিনি।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ও বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদুল হাসান। তিনি বলেন, তাঁর বাবা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও চিকিৎসক আখলাকুল হোসাইন আহমেদের সঙ্গে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সখ্য ছিল। এ জন্য গুণী এই ব্যক্তিকে তিনি কাছ থেকে দেখার ও জানার সুযোগ পেয়েছিলে। শৈলজারঞ্জন মজুমদারের অবদান দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা; দেশে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার, প্রশিক্ষণ ও নতুন নতুন সংগীতশিল্পী সৃষ্টিতে অবদানসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রাচীন শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা, সংরক্ষণ ও উৎসব আয়োজন করতে এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে শিল্পী, গবেষক ও পর্যটকেরা এসে সংস্কৃতি প্রসারে কাজ করবেন।
মোহনগঞ্জ উদীচীর উপদেষ্টা কবি রইস মনোরম বলেন, কেন্দ্রটি চালু হলে একদিকে যেমন শৈলজারঞ্জনের স্মৃতি ও ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হবে, অন্যদিকে হাওর বাংলার সংস্কৃতি পুনর্জীবিত ও দুই বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি হবে।
কেন্দ্রটি দেখতে এখনই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংস্কৃতিপ্রেমীরা ভিড় জমাচ্ছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়ন করছে। মূল সড়ক থেকে কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তাটি শৈলজারঞ্জন মজুমদারের নামে নামকরণ করা হবে।
‘শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জীবনী’ নামের একটি গ্রন্থ লিখেছেন প্রাবন্ধিক সঞ্জয় সরকার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রসায়নশাস্ত্রের ছাত্র শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনের বাইরে তিনিই প্রথম ১৯৩২ সালে নেত্রকোনা দত্ত উচ্চবিদ্যালয় মাঠে রবি ঠাকুরের জন্মদিন উদ্যাপন করেন বলে জানা যায়। জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুশি হয়ে শৈলজারঞ্জনকে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন। শৈলজারঞ্জন মজুমদারের গ্রামের বাড়িতে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হওয়ায় আমরা গর্বিত। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অঞ্চলের সংস্কৃতি আরও প্রসারিত হবে।’