
মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় অস্ত্র হাতে গুলি করা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে চারজনকে শনাক্ত করা গেছে। সংঘর্ষের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পরিচয় জানা গেছে।
এদিকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও আজ রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই অস্ত্রধারীদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় কোনো মামলাও হয়নি। তবে অস্ত্রধারীসহ সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা হলেন মুন্সিকান্দি গ্রামের দিদার দেওয়ানের ছেলে ফাহিম দেওয়ান, তোতা দেওয়ানের ছেলে একরাম দেওয়ান, মোতা সরকারের ছেলে একরামুল সরকার ওরফে ছোট একরাম, নাজির সরকারের ছেলে জিহাদ সরকার। তাঁরা সবাই সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আহমেদ ও মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আওলাদ হোসেন মোল্লার সমর্থক।
গতকাল শনিবার দুপুরে মুন্সিকান্দি গ্রামে উজির আহমেদ ও আওলাদ হোসেন মোল্লার সমর্থকদের সঙ্গে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতাউর রহমান (মল্লিক) ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ওয়াহিদ রায়হানের সমর্কদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে ককটেলের স্পিন্টার ও গুলিবিদ্ধ হয়ে উভয় পক্ষের পাঁচজন আহত হন। নির্বাচনী প্রচারের সময় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও এলাকার বাসিন্দারা বলেন, সংঘর্ষটি নির্বাচনী প্রচারকে কেন্দ্র করে নয়; বরং মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের ওই নেতাদের পূর্ববিরোধের কারণেই ঘটেছিল। তবে পক্ষ দুটি নির্বাচনকে ব্যবহার করে আলাদা ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আতিক-ওয়াহিদের কয়েক শতাধিক লোক ফুটবল প্রতীকের স্লোগান দিতে দিতে মুন্সিকান্দি গ্রামে আসেন। সে সময় উজির পক্ষের লোকজন ধানের শীষ প্রতীকের প্রচার ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। তাঁরাও ধানের শীষ প্রতীকের স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এরপর শুরু হয় সংঘর্ষ।
এলাকার বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির অন্তত ২০ জন মানুষ বলেন, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে বসবাসকারী সে দলের নেতারা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যান। আওয়ামী লীগের আমলে পক্ষ দুটির নেতৃত্ব দেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। তখন বিএনপির সমর্থকেরা ওই দুই পক্ষে ভাগ হয়ে সংঘর্ষে জড়াতেন। বিএনপির বড় নেতারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগের নেতাদের আর্থিকভাবে ও লোকজন দিয়ে সহযোগিতা করতেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সামনে আসেন বিএনপি নেতা উজির আহমেদ-আওলাদ হোসেন মোল্লা এবং আতাউর রহমান (মল্লিক) ও ওয়াহিদ রায়হানরা। তখন থেকে শুরু হয় বিএনপির নেতাদের আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি। তাঁরাও দল ভারী করতে আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীদের এলাকায় এনে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিবদমান পক্ষ দুটির মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. কামরুজ্জামানের নির্বাচন করছেন উজির-আওলাদ হোসেনরা। ফুটবল প্রতীকের মহিউদ্দিনের নির্বাচন করছেন আতিক-ওয়াহিদের সমর্থকেরা।
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, মোল্লাকান্দির ঘটনাটি একটি এলাকাভিত্তিক দ্বন্দ্ব। ঘটনার সময় ধানের শীষের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচার কর্মসূচি ছিল না এবং কোনো জ্যেষ্ঠ নেতা–কর্মীও উপস্থিত ছিলেন না। বিএনপি ও নির্বাচনী পরিবেশকে বিতর্কিত করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এলাকাভিত্তিক দ্বন্দ্বকে নির্বাচনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব বলে চালানো হচ্ছে।
এদিকে গতকাল গোলাগুলির ঘটনায় আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুল ইসলাম। ওসি বলেন, সংঘর্ষে অস্ত্র হাতে যে ব্যক্তিরা ছিলেন, ইতিমধ্যে তাঁদের মধ্য থেকে তিনজনকে শনাক্ত করতে পেরেছেন তাঁরা। এ ছাড়া যাঁরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
আওয়ামী লীগের সময় থেকে চলতি বছর পর্যন্ত গত আট বছরে মোল্লাকান্দিতে পূর্ববিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ গেছে অন্তত আটজনের। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সময় তাদের দুই পক্ষের চারজন, অন্তবর্তী সরকারের এ সময়ে গত বছরের নভেম্বরে তিনজন এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একজন নিহত হন।
গত বছরের নভেম্বরে চরডুমুরিয়ার আরিফ মীর, রায়হান এবং বেহের কান্দি এলাকার তুহিন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মধ্যমাকাহাটি এলাকার ছানা মাঝিকে, একই বছর মুন্সিকান্দি এলাকার ডালিম সরকার, ২০২৩ সালে মোল্লাকান্দির এলাকার তুহিন মাদবর, ২০২১ সালে নয়া আমঘাটা এলাকার জালার ব্যাপারী এবং ২০১৮ সালে চৈতারচর এলাকায় মানিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
আজ দুপুরে মুন্সিকান্দি এলাকার বাসিন্দা মো. আউয়াল মাদবরের (৯০) সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এলাকার প্রবীণ এই বাসিন্দা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের আধিপত্যের লড়াই সাত-আট বছরের নয়। এটি কয়েক যুগ ধরে চলছে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসছে, তারা এই সংঘর্ষের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। এতে এলাকার সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। কথায়–কথায় এলাকায় বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছে। অস্ত্র নিয়ে গুলি করা হচ্ছে। পাখির মতো মানুষ মারা হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার পর এলাকায় মামলা হচ্ছে। যাঁরা মারামারি লাগান, তাঁরা ধরা–ছোঁয়ার বাইরে থাকেন। ছোট কর্মী ও সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী হচ্ছেন। আউয়াল মাদবরের প্রশ্ন, এ অবস্থা আর কত দিন চলবে! মৃত্যুর আগে সামাধান দেখে যেতে পারবেন কি না, জানেন না।
ইউনিয়নটির আমঘাটা এলাকার আরেক বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিএনপি-আওয়ামী লীগ—সব আমলেই দুটি পক্ষ হয়, সংঘর্ষ হয়। এতে কখনো এক পক্ষ এলাকায় থাকে, আরেক পক্ষ এলাকার বাইরে থাকে। যখনই বাইরে থাকা পক্ষটি এলাকায় উঠতে যায়, তখনই সংঘর্ষ বাধে। এতে সব সময় এ ইউনিয়নের মধ্যে অশান্তি লেগেই আছে। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা ইউনিয়নে শান্তি চাই।’
এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে কেউ পার পাবে না বলে জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফিরোজ কবির। তিনি বলেন, বিবদমান দুটি পক্ষের মধ্যে একপক্ষের ওয়াহিদ-আতিক মল্লিকদের কয়েক মাস আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা জেলহাজতে রয়েছেন। অন্য পক্ষে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এলাকায় অশান্তি তৈরি করছেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। আইনের ব্যত্যয় করে কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না।