সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে সারা বছর অনাবাদি জমিতে ফসল ফলান মো. মনিরুজ্জামান
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে সারা বছর অনাবাদি জমিতে ফসল ফলান মো. মনিরুজ্জামান

পাথরের গ্রামে এখন মাঠভরা ফসল, পুকুরভরা মাছ, সব কৃতিত্ব মনিরের

দিগন্তজোড়া হলুদ শর্ষে ফুল আর শাকসবজির বাগান। ডানে-বাঁয়ে বাতাসে দোল খাচ্ছে গম, ধান, ভুট্টা গাছের সবুজ পাতারা। খেতঘেঁষা এক ঘরে ওড়াওড়ি করছে কবুতর। পাশেই দুই পুকুরে লাফাচ্ছে মাছ। খামারে হাম্বা হাম্বা করছে গরু। কাছের এক ঘরে উৎপাদিত হচ্ছে জৈব সার।

সমন্বিত আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির এই দৃশ্য দেখা গেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে। দেশের বৃহত্তম পাথরকোয়ারি ভোলাগঞ্জ–সংলগ্ন এ গ্রামের মানুষ কয়েক বছর আগেও পাথরকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা আমন ধান ছাড়া কিছুই চাষ করতেন না। এখন গ্রামটিতে রীতিমতো সবুজের বিপ্লব চলছে। এর নায়ক মো. মনিরুজ্জামান। তাঁর দেখানো পথেই গ্রামের প্রায় সবাই চাষাবাদে এগিয়ে এসেছেন।

৪০ ছুঁই ছুঁই মনিরুজ্জামানের বাড়ি উপজেলার পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নের কালীবাড়ি গ্রামে। বাড়ির পাশেই পাথরকোয়ারি। আশপাশের অনেকের মতো তিনিও ছিলেন পাথর ব্যবসায়ী। স্থানীয় পাথর কেনার পাশাপাশি তিনি পাথর আমদানিকারকও ছিলেন। ২০১৮ সালে যখন সরকারি নির্দেশনায় কোয়ারির পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে পড়ে, তখন অনেকের মতো তিনিও বেকার হয়ে পড়েন। তাঁর বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনেরা কাজের আশায় যেতে থাকেন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। মনিরুজ্জামান কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।

ঘরে স্ত্রী আর ছোট তিন সন্তান। তাদের ফেলে রেখে প্রবাসী হওয়ার বিষয়টিও মনিরের মনে সায় দিচ্ছিল না। ওই সময়টাতে একদিন কালীবাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের রাধানগর গ্রামে যান। সেখানে দেখেন, বিঘার পর বিঘা অনাবাদি জমি। এসব জমি চাষাবাদের আওতায় আনার পরিকল্পনা তাৎক্ষণিক তাঁর মাথায় আসে। যেই ভাবা, সেই কাজ। কয়েক দিনের মধ্যে কিছু জমি কিনে আর কিছু জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন চাষাবাদ।

শুরুর দিকটায় রাধানগর গ্রামের বাসিন্দারা মনিরের কাজকে ‘অসাধ্য ও পাগলামি’ বলে মনে করতেন; কিন্তু পরিশ্রম আর একাগ্রতায় অসাধ্য সাধন করেন তিনি। এখন ‘পাথরের পৃথিবী’খ্যাত সীমান্তবর্তী রাধানগর গ্রামে ফোটালেন ফুল, ঘটালেন সবুজের বিপ্লব। স্বপ্ন এখন তাঁর হাতের মুঠোয় বন্দী। স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ পেরিয়ে তিনি এখন চাইছেন, রাধানগর গ্রামটি কৃষিজ আর প্রাণিজ সম্পদের এক আধারে পরিণত করবেন।

শুরুর গল্প

শুরুটা ২০১৯ সালে। রাধানগর গ্রামে তিনি পরিত্যক্ত একটা দোতলা বাড়ি কম দামে কেনেন। আটটি কবুতর কিনে সে বাড়িতে তৈরি করেন খামার। কিছুদিন পর সিলেটের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কম টাকায় কেনেন মিসরীয় ফাউমি মুরগি। ধীরে ধীরে তাঁর পসার বাড়ে। এরপর কেনেন গ্রামের কিছু অনাবাদি জমি। বর্গাও নেন কিছু পরিত্যক্ত পতিত জমি। সেসব জমিতে ধানের পাশাপাশি শুরু করেন শাকসবজির ফলন।

মনির ‘পাথরের গ্রাম’খ্যাত সীমান্তবর্তী রাধানগরে ফোটালেন ফুল, ঘটালেন সবুজের বিপ্লব

প্রথম বছরেই সাফল্য আসে। মনিরুজ্জামানের উৎপাদিত শাকসবজি কিনতে পাশের হাটবাজার থেকে পাইকারেরা আসেন। মুখে মুখে সে খবর রটে। চাহিদা বাড়ে তাঁর মুরগি আর সবজির। পরের বছর আরও অনাবাদি জমির ইজারা নেন। সেখানে শর্ষে, গম, ভুট্টা, লালশাক, ঝিঙা, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, আলু, খিরা, শসা, সূর্যমুখী, রসুন, পেঁয়াজসহ নানা সবজি ফলান। বস্তার মধ্যে উৎপাদন করেন আদা। এ ছাড়া আমনের পাশাপাশি আউশ ও বোরো ধানের আবাদও করেন। তাঁর হাত ধরে যেন সোনা ফলে। সব চাষেই ধরা দেয় অভাবনীয় সাফল্য।

মনিরকে সাফল্যের নেশায় পেয়ে বসে। কৃষিতে সাফল্য পেয়ে তৈরি করেন গরুর খামার। সেখানেও পান সফলতা। এরপর প্রায় মরা দুটি পুকুর খনন করে মাছের পোনা ছাড়েন। কয়েক মাস যেতেই তাঁর পুকুরজুড়ে লাফালাফি করতে থাকে হাজারো কার্ফু, ব্রিগেড, রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, গ্রাস কার্প। মাছ যত লাফায়, মনিরের মুখের হাসি তত চওড়া হয়। এখন তো উপজেলা ছাড়িয়ে জেলায়ও তিনি এক আদর্শ চাষি হিসেবে সুপরিচিত। এরই স্বীকৃতি মেলে ২০২৫ সালে। সেবার তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাঁকে দিয়েছে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। সবাইকে ডিঙিয়ে তিনি হয়েছেন প্রথম।

পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু

যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সফলতা পেয়েছেন মনির। তিনি বলেন, এখন দুটি পুকুরে তিনি মাছের চাষ করছেন। এসব মাছ পাইকারি দরে ব্যবসায়ীরা এসে কিনে নিয়ে যান। মাছের ব্যবসায় লাভ বেশি। অল্প দামে পোনা কিনে পুকুরে ছেড়ে দিলে পরে বেশি দামে বেচা যায়। এ জন্য কয়েক দিন আগে আরেকটি পরিত্যক্ত পুকুর খনন করেছেন। কিছুদিনের মধ্যে সেখানেও মাছ চাষ শুরু করবেন।

মনির বলেন, তিনি কিছুদিন আগে পুকুরে ১৬ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। এরই মধ্যে ওই পোনা কেনার সমপরিমাণ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। পুকুরে আরও এক লাখ টাকার বেশি মাছ আছে। মাছের ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় তিনি রেণু পোনা উৎপাদনও শুরু করবেন। এসব রেণু পোনা তাঁর পুকুরে ছাড়ার পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পরিকল্পনাও তাঁর আছে।

নির্ঝঞ্ঝাট সুন্দর জীবন আমার। প্রাকৃতিক পরিবেশে মনের আনন্দে নিজের কাজ করছি। বিদেশে গেলে অন্যের দোকানে কাজ করতে হতো, এখন আমার এখানে তিনজন শ্রমিক স্থায়ীভাবে কাজ করছেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে?
মো. মনিরুজ্জামান

বর্তমানে তাঁর খামারে ১০টি গরু আছে। এসব গরুর দুধ আশপাশের এলাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া বড় পরিসরে ৮ শতাংশ জায়গার মধ্যে একটি খামার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। দ্রুতই এখানে আরও গরুর পাশাপাশি ছাগল পালনও শুরু করবেন। এসব গরু, ছাগল পাইকারি দরে বেচবেন।

‘ক্ষেতে-ক্ষেতে ঝরিতেছে’ ফসল

এক বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, রাধানগর গ্রামটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। ওপাশে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি। ওই চেরাপুঞ্জির আকাশ আর পাহাড়ের সম্মিলন পেরিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নৈসর্গিক পরিমণ্ডলে রাধানগর গ্রামের অবস্থান। গ্রামের যেখানে শেষ, এর পরেই মনিরুজ্জামানের কৃষিজমি শুরু।

গ্রামের শেষ সীমানার মেঠো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনিরুজ্জামান দেখান তাঁর কৃষিজমি। জানান, প্রায় ৬০০ শতাংশ জায়গায় তিনি নানা ধরনের ফসল উৎপাদন করছেন। আমন, আউশ ও বোরো ধান চাষের পাশাপাশি অন্তত ২০ প্রজাতির সবজি ফলাচ্ছেন। এক দিনের জন্যও কোনো জমি অনাবাদি রাখছেন না। ধান কাটা শেষ হলেই পরদিন ওই জমিতে শাক কিংবা শসার বীজ ফেলছেন, আবার শর্ষে কাটার পরদিনই বুনছেন অন্য কোনো ফসল। যখন যে কৃষিপণ্য উৎপাদনের সময়, তখনই তিনি সেটিই ফলাচ্ছেন।

মনির ধান কাটা শেষ হলেই পরদিন ওই জমিতে শাক কিংবা শসার বীজ ফেলছেন, আবার শর্ষে কাটার পরদিনই বুনছেন অন্য কোনো ফসল

পানির তীব্র সংকটের কারণে শুরুর দিকটায় চাষাবাদ খুব মুশকিল ছিল বলে মনিরুজ্জামান জানান। তিনি বলেন, ‘পানি ছাড়া চাষাবাদ কঠিন। রাধানগর গ্রাম থেকে নদীও অনেক দূরে। ২০২৩ সালে সরকারি উদ্যোগে এখানে মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের একটি সংযোগ চালু করে। ওই সংযোগ থেকে আটটি সাব-সংযোগ আশপাশের জমিতে নেওয়া হয়। যেহেতু আমার দেখাদেখি এখন অনেকেই পতিত জমি আবাদের আওতায় নিয়ে আসছেন, ফলে এসব চাষিও এখন ওই পানি ব্যবহার করে ফলন ভালোভাবে করতে পারছেন।’

মনির একই জমিতে একসঙ্গে একাধিক ফসল ফলানোর চেষ্টা করছেন। ভুট্টার পাশাপাশি লালশাক করেছেন। এখন এক বিঘা জমিতে ধানের পাশাপাশি একই সঙ্গে কলা গাছও রোপণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ছাড়া আগামীতে কুল ও পেয়ারাসহ নানা ধরনের ফলের আবাদের চিন্তা আছে তাঁর।

আরও যত সফলতা

সবজি, মাছের চাষ বা গরু, কবুতর ও মুরগির খামার ছাড়াও অনেক কাজে সফলতা পেয়েছেন মনির। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কোম্পানীগঞ্জের সহায়তায় ৩ শতাংশ জায়গায় ভার্মি কম্পোস্ট (জৈব সার) উৎপাদন করছেন। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এক বছর আগে এ উদ্যোগ নেন তিনি।

মনিরুজ্জামান বলেন, গত এক বছরে তিনি চারবার জৈব সার উৎপাদন করেছেন। জমিতে জৈব সার ব্যবহার করায় তাঁর ফলন বেড়েছে। বিষমুক্ত এ সার ব্যবহারের কারণে তাঁর উৎপাদিত শাকসবজি ও কৃষিপণ্যের চাহিদাও পাইকারি ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া নিজের জমিতে ব্যবহারের পর অতিরিক্ত সার তিনি গ্রামের অন্য চাষিদের কাছে বিক্রি করছেন। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার বিক্রির জন্য তিনি উৎপাদন আরও বাড়াবেন বলে ভাবছেন।

মনির জৈব সার উৎপাদন করছেন। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে এক বছর আগে এ উদ্যোগ নেন তিনি

ছোট একটি অটো রাইসমিলও বসিয়েছেন মনির। এখানে ধান থেকে চাল করার পাশাপাশি ভুট্টা, গম, হলুদ, মরিচ ও জিরাগুঁড়া করেন। রাধানগর গ্রামসহ আশপাশের মানুষেরা অল্প টাকায় এ মিল ব্যবহার করেন। এ ছাড়া শর্ষে থেকে তেল করার জন্য ছোট একটি মেশিনও আছে তাঁর। এর বাইরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ভর্তুকি মূল্যে আধুনিক বেশকিছু কৃষি যন্ত্রপাতি কিনেছেন। কিছু যন্ত্রপাতি সরকারিভাবে বিনা মূল্যে পেয়েছেন। সেসব তিনি গ্রামবাসীকেও ব্যবহার করতে দিচ্ছেন।

আলোর দিশা পেলেন অন্যরাও

রাধানগর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, মনির এক ফসলি জমিকে একাধিক ফসলি জমিতে রূপ দিয়েছেন। সফলতা আসায় তাঁর দেখাদেখি এখন অন্যরাও চাষাবাদে উৎসাহী হচ্ছেন। বিশেষ করে চলতি বছর গ্রামের অনেকে শর্ষে চাষ করেছেন। শতাধিক চাষি অন্তত ১৫ হাজার শতাংশ জমিতে শর্ষে চাষ করেছেন।

রাধানগর গ্রামের কৃষক মো. ইয়াসিন বলেন, তিনি মনিরুজ্জামানকে দেখে উৎসাহিত হয়ে চলতি বছর পাঁচ বিঘা জমিতে শর্ষে আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে ফসল কাটবেন। লাভ হলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে শর্ষের পাশাপাশি অন্যান্য সবজি চাষের চিন্তা আছে তাঁর।

অ্যাগ্রো রিসোর্ট তৈরি করতে চাই। মানুষ এখানে এসে প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগের পাশাপাশি নির্ভেজাল শাকসবজি, মাছ, মাংস খাবেন। বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেবেন।
মো. মনিরুজ্জামান

মো. এনামুল হক নামের আরেক কৃষক জানান, তিনি ৬০ শতাংশ জমিতে শর্ষে চাষ করেছেন। মনিরুজ্জামানের হাত ধরে কৃষিতে যে সফলতা এসেছে, সেটি এখন রাধানগরসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন অনেকেই পতিত জমিকে আবাদের আওতায় নিয়ে আসছেন।

রাধানগর গ্রামের মানুষ জানলেন, একজন আদর্শ কৃষকের পাশাপাশি মনির সমাজকর্মীও। তাঁদের কয়েকজনের অর্থায়নে স্থানীয়ভাবে একটি মসজিদ পরিচালিত হচ্ছে। বেশ কয়েকটা দুস্থ পরিবারের ভরণপোষণও করছেন তাঁরা কয়েকজন। মনিরুজ্জামান কোম্পানীগঞ্জ টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি। এ ছাড়া সিলেট স্বপ্ন রক্তদান ও সমাজকল্যাণ সংস্থার একজন সদস্য হিসেবে এ পর্যন্ত রক্তদান করেছেন ৪২ বার।

তৈরি করতে চান অ্যাগ্রো রিসোর্ট

আগামী বর্ষার মধ্যে একটি অ্যাগ্রো রিসোর্ট (কৃষি খামার ও পর্যটনের সংমিশ্রণ) তৈরির পরিকল্পনা আছে বলে জানান মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের গ্রাম কালীবাড়ি থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন সকালে রাধানগরে আসি। দুপুরে বাড়িতে খেতে যাই। পরে বিকেলে আবার আসি। ফিরি সন্ধ্যা সাতটা কিংবা রাত আটটার দিকে। আসলে সীমান্তলাগোয়া এ জায়গার মায়ায় পড়ে গেছি। কী সুন্দর জায়গা!’

মনির একই জমিতে একসঙ্গে একাধিক ফসল ফলানোর চেষ্টা করছেন

মনির বলেন, ‘সামনে তাকালেই মেঘালয়ের সারি সারি সুউচ্চ পাহাড়। বর্ষায় সেই পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ ভেসে বেড়ায়। তখন পুরো এলাকাটি অপরূপ সৌন্দর্যে রূপ নেয়। এটি মাথায় রেখেই অ্যাগ্রো রিসোর্ট তৈরি করতে চাই। মানুষ এখানে এসে প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগের পাশাপাশি নির্ভেজাল শাকসবজি, মাছ, মাংস খাবেন। বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেবেন। এরই মধ্যে জায়গাও প্রস্তুত করেছি। দ্রুতই রিসোর্ট তৈরির কাজ শুরু করব।’

আক্ষেপহীন সুন্দর জীবন

মনির বলেন, ‘পাথরের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কেন আমি গেলাম না, এ নিয়ে তখন সাময়িক সময়ের জন্য আক্ষেপ ছিল; কিন্তু এখন আর আক্ষেপ নেই। নির্ঝঞ্ঝাট সুন্দর জীবন আমার। প্রাকৃতিক পরিবেশে মনের আনন্দে নিজের কাজ করছি। বিদেশে গেলে অন্যের দোকানে কাজ করতে হতো, এখন আমার এখানে তিনজন শ্রমিক স্থায়ীভাবে কাজ করছেন। প্রতিদিন সাত থেকে আটজন শ্রমিক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। অন্যের কর্মসংস্থানের উপলক্ষ আমি হতে পারছি, এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে?’

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন জানিয়ে মনির বলেন, ‘দেশ ঘোরা আমার নেশা। প্রতিটি জেলা সফর করেছি। অন্তত ২১টি জেলায় নানা ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিষয়ে হাতে–কলমে পাঠ নিয়েছি। সেসব আমার চাষাবাদ-পরিকল্পনায় প্রয়োগও করছি। সফলতার এটিও একটি কারণ।’

মনিরুজ্জামানের সাফল্যের প্রশংসা করলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ আনিছুজ্জামান। তিনি বলেন, যে এলাকার সবাই কমবেশি পাথরের ব্যবসা কিংবা উত্তেলনের সঙ্গে জড়িত, সেখানে অনাবাদি জমিকে আবাদের আওতায় এনে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করেছেন মনিরুজ্জামান। পরিত্যক্ত জমিও তিনি চাষাবাদের আওতায় এনেছেন। তাঁর মতো কৃষকই আমাদের আদর্শ। তিনি এখন অনেকেরই অনুপ্রেরণা।