খুলনা-১ আসনে জয়ী আমীর এজাজ খান ও খুলনা-৫ আসনে জয়ী মোহাম্মদ আলি আসগার
খুলনা-১ আসনে জয়ী আমীর এজাজ খান ও খুলনা-৫ আসনে জয়ী মোহাম্মদ আলি আসগার

খুলনা-১ ও ৫ আসনে ইতিহাস গড়ে বিএনপির জয়

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের ব্যতিক্রম ছাড়া স্বাধীনতার পর কখনো খুলনা-১ ও খুলনা-৫ আসনে জয় পায়নি বিএনপি। হিন্দু ভোটার অধ্যুষিত আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই দুই আসন এবার প্রথমবারের মতো বিএনপির দখলে গেল।

খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালে পরাজিত হয়ে এবার চতুর্থবার বিএনপির প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের পর খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে আর কখনো বিএনপি প্রার্থী দেয়নি। দীর্ঘ ২৯ বছর পর এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে বিসিবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলি আসগার (লবি) জয়ী হয়েছেন।

খুলনা-১ আসন

এবারের নির্বাচনে খুলনা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শুরু থেকেই হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রচার চালান। স্থানীয় সন্তান হিসেবে আগের তিনবারের পরাজয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের রায় তাঁর পক্ষেই যায়।

এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দাকোপ উপজেলায় ৫৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ মানুষ হিন্দু এবং বটিয়াঘাটায় এই হার ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

এই আসনে জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান বরাবরই দুর্বল। ১৯৯৬ সালের পর এখানে তারা প্রার্থী দেয়নি। হিন্দু ভোটারদের লক্ষ্য করে এবার জামায়াতে ইসলামী প্রথমবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করে আলোচনার জন্ম দেয়। কৃষ্ণ নন্দী এই এলাকার ভোটার ছিলেন না। তিনি প্রচারে হিন্দুদের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি।

এখানে বিএনপির আমীর এজাজ খান পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছেন ৭০ হাজার ৩৪৬ ভোট। ভোটের ব্যবধান ৫১ হাজার ৬টি।

জয়ের পর আমীর এজাজ খান বলেন, ‘তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই এলাকার মানুষের পাশে আছি। এবার হিন্দু-মুসলমান সব সম্প্রদায়ের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’

প্রথম দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান খুলনা-১ আসন ছিল খুলনা-৫ আসন নামে। প্রথম সংসদে আওয়ামী লীগের কুবের চন্দ্র বিশ্বাস এবং দ্বিতীয় সংসদে প্রফুল্ল কুমার শীল নির্বাচিত হন। এরশাদ শাসনামলে ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের শেখ হারুনুর রশিদ এবং ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির শেখ আবুল হোসেন নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে আবারও শেখ হারুনুর রশিদ জয়ী হন।

১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা জয়ী হয়ে আসনটি ছেড়ে দিলে স্বতন্ত্র প্রার্থী পঞ্চানন বিশ্বাস নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ২০০১ সালে পঞ্চানন বিশ্বাস, ২০০৮ সালে ননী গোপাল মণ্ডল এই আসন থেকে জয়ী হন।

খুলনা-৫ আসন

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চারদলীয় জোট গঠনের পর বিএনপি খুলনা-৫ আসনটি জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে দেয়। এর পর থেকে এখানে বিএনপি আর প্রার্থী দেয়নি। এবার ২৯ বছর পর প্রার্থী হন মোহাম্মদ আলি আসগার (লবি)।

আলি আগসার ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙা) আসনে উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন। ওই সময় ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি বেশ আলোচিত ছিলেন। এবার নিজের পিতৃভূমিতে নির্বাচন করেন।

জামায়াতে ইসলামী এখানে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে প্রার্থী করে। তিনি ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ ও ২০১৮ সালেও জোটের প্রার্থী ছিলেন, তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে হেরে যান।

এই আসনে লক্ষাধিক হিন্দু ভোটার রয়েছেন। তাঁদের ভোট পেতে দুই প্রার্থীই চেষ্টা চালান। শেষ পর্যন্ত হিন্দু ভোট বিএনপির দিকেই গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মিয়া গোলাম পরওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬ ভোট। বিজয়ী মোহাম্মদ আলি আসগার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ ভোট। ভোটের ব্যবধান ২ হাজার ৬০৮ ভোট।

প্রথম দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান খুলনা-৫ আসন ছিল খুলনা-৯ আসন নামে। ওই দুই সংসদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরশাদ শাসনামলে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির এইচ এম এ গাফফার এই আসনের সংসদ সদস্য হন। তিনি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গণ–অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালাহ উদ্দিন ইউসুফ জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আবার সালাহ উদ্দিন ইউসুফ জয়ী হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ নির্বাচিত হন।

২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর মিয়া গোলাম পরওয়ার জয়ী হন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এই আসন থেকে জয় পান।