বরগুনার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় মেঝেতে রেখে শিশুদের চিকিৎসা চলছে। গতকাল সোমবার বিকেলে
বরগুনার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় মেঝেতে রেখে শিশুদের চিকিৎসা চলছে। গতকাল সোমবার বিকেলে

বরিশাল বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, বেশি আক্রান্ত বরগুনায়

বরিশাল বিভাগের সব জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই হামের উপসর্গ নিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। শয্যা–সংকটের কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশুকে এবং কোথাও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বিভাগে মঙ্গলবার পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে বরগুনায়।

হামের চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা (রক্ত, থ্রোট সোয়াব) সংগ্রহ করে সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে সেগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠানো হয়। দেশের একমাত্র হাম-রুবেলা ল্যাব ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের (আইপিএইচ) ল্যাবে পাঠানো হয়। এতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

টিকা না পাওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ও ১৫ মাসে দ্বিতীয় টিকা দেওয়া হয়। বর্তমানে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ১১ মাসের মধ্যে। এর মধ্যে ৭ মাস বয়সী শিশুদের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি।

হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক বিকাশ চন্দ্র নাগ প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণত ৯ মাসের পর থেকে শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়। অথচ তার চেয়ে কম বয়সী শিশুরা এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি।

হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল মোনায়েম সাদ বলেন, হাসপাতালে হামের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পৃথক তিনটি আইসোলেশন কক্ষে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা চলছে। সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অক্সিজেন সরবরাহ আছে। তিনি বলেন, হামের পরীক্ষা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এখন লক্ষণ দেখেই চিকিৎসায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এতে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ৩৭ শিশু চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত তিন মাসে এখানে ১৩০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মার্চ মাসেই ভর্তি হয়েছে ১১১ শিশু, যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আজ দুপুরে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশুদের চিকিৎসার জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সেখানে ১৯টি শয্যা থাকলেও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় একটি শয্যায় দুই থেকে তিনজন শিশুকে রাখা হচ্ছে। আরেকটি কক্ষে শয্যা না থাকায় মেঝেতে শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন অভিভাবকেরা।

হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক শিশুর স্বজন সালেহ উদ্দিন অভিযোগ করেন, তাঁর সন্তান টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য এখানে ভর্তি করান। পরে তাকে হাম আক্রান্ত এক শিশুর সঙ্গে একই শয্যায় দেওয়া হয়। এরপর তাঁর সন্তানও হামে আক্রান্ত হয়।

আইসোলেশন ওয়ার্ডের ইনচার্জ সেবিকা সেলিনা আক্তার বলেন, রোগীর চাপ বাড়ায় দুটি পৃথক কক্ষ চালু করা হয়েছে। একটি কক্ষে চারটি শয্যা আছে। অন্য কক্ষে শয্যা না থাকায় মেঝেতে শিশুদের রাখা হচ্ছে। একইভাবে দ্বিতীয় তলায় শিশু ওয়ার্ডেও হামের রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ রাখা হয়েছে, যেখানে ১৫টি শয্যা আছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বছর বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২০৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৬০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৫১ জনের হাম ও তিনজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত মারা গেছে ৮ শিশু। ভর্তি ও শনাক্ত রোগীর বেশির ভাগই চলতি মার্চ মাসে হাসপাতালে এসেছে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের মধ্যে এভাবে হামের সংক্রমণ আগে দেখা যায়নি। বিভাগের মধ্যে বরগুনায় প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সব হাসপাতালেই আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে।

বেশি আক্রান্ত বরগুনায়

বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে বরগুনায় বেশি হাম আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে জ্বর ও সারা শরীরে ফুসকুড়ির উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ বরগুনার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করেছে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিভাগে মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৬০ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৫১ জনের হাম ও তিনজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বরগুনায় ২২ জন, এরপর বরিশালে ১৫ জন, ভোলায় ৫ জন, ঝালকাঠিতে ৬ জন, পটুয়াখালীতে ২ জন ও পিরোজপুরে একজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বরগুনায় ২ জন ও বরিশালে ১ জনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ৭৭ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল।

মৃত্যুর সংখ্যাতেও এগিয়ে বরগুনা। মোট ৮ মৃত্যুর মধ্যে তিনজনই এই জেলার। এ ছাড়া বরিশালে একজন এবং ভোলা ও পিরোজপুরে দুজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৪৯ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ২২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া আরও ১৩ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে। সেটার প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার আইসোলেশন ওয়ার্ডে ১৮ জন ভর্তি ছিল। রোগীর চাপে শয্যা–সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

বরগুনা সদর উপজেলার ফুলঝুরি ইউনিয়নের সাহেবের হাওলা গ্রামের ৮ মাসের শিশু জুবায়েরকে হামের উপসর্গ নিয়ে সোমবার সকালে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার বাবা মো. নাঈম বলেন, তিন দিন ধরে জ্বর ও শরীর লাল হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে এনেছেন।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ মেহেদী পারভেজ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বর নিয়ে আসা শিশুদের মধ্যে অনেকের শরীরে হামের লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় আক্রান্তদের আলাদা রাখা হচ্ছে।