জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউের করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ)। গত রোববার বিকেলে
জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউের করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ)। গত রোববার বিকেলে

জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল

ঠিকানা দিনাজপুরে, আস্থা দেশজুড়ে

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। তিন দশক আগে দিনাজপুর শহরে এই হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন পরিচালিত এই হাসপাতালে প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। এমনকি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও এখন এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেন।

মূলত দুটি কারণে মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন এবং ভরসা রাখেন। প্রথমত, চিকিৎসা ও সেবার মান ভালো। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা ব্যয় কম। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। বাগেরহাটের চিতলমারীর বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য (৪৫) হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা করিয়েছেন জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। তিনি গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা নেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রে দ্রুত অস্ত্রোপচার না করলে জটিলতা বাড়তে পারে।

দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের এক চিকিৎসকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বৈদ্যের পরিচয় ছিল। সেই চিকিৎসকের পরামর্শে এখানে এসে ভর্তি হন তিনি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি (হৃদ্‌যন্ত্রে অস্ত্রোপচার) হয়। তাঁর সঙ্গে গত সপ্তাহে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ‘এখন বেশ ভালো আছি। হাসপাতালের বিল পরিশোধের সময় বিশেষ ছাড় দিয়েছিল আমাকে। এই হাসপাতালের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’

হৃদ্‌যন্ত্রে রিং পরানো, পেসমেকার স্থাপন এবং ওপেন হার্ট সার্জারির পাশাপাশি জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জারি, জেনারেল সার্জারি, অর্থোপেডিক সার্জারি, গলব্লাডার অস্ত্রোপচার, ক্যানসার চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিস, গাইনি ও অবস, ফিজিওথেরাপি ও দাঁতের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, ইকো, ইটিটি ও সিটি স্ক্যানের সুবিধাও রয়েছে।

জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন রোগী চিকিৎসা নেন, যাঁদের বেশির ভাগই হৃদ্‌রোগী। আর হাসপাতালে নিয়মিত ভর্তি থাকেন শতাধিক রোগী। তাঁদের মধ্যে গড়ে ৩০ জন হৃদ্‌রোগী। জরুরি বিভাগেও প্রতিদিন অর্ধশতাধিক রোগী সেবা নেন। প্রতিদিন গড়ে ১৫টির বেশি অস্ত্রোপচার হয়।

জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে শয্যা আছে ৩৫০টি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিক্যাল অফিসার, নার্সসহ ১৫২ জন এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১৫০ জন কর্মী এখানে কাজ করছেন। ২১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

শুরুটা ভাড়া বাসায়

অসংক্রামক রোগ মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯২ সালে তৎকালীন মন্ত্রী বেগম খুরশিদ জাহান হক জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৯৩ সালে দিনাজপুর শহরের মুন্সিপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছর শহরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় জমি কিনে ভবন নির্মাণ করা হয়। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এটি স্বেচ্ছাসেবী, অলাভজনক ও নিজস্ব আয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান।

৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পরে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। সময়ের সঙ্গে এর পরিধি বাড়তে থাকে। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে গড়ে উঠেছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ২৫০ শয্যার কেয়ার স্পেশালাইজড জেনারেল হাসপাতাল ও দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ।

একই চত্বরে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে মোজাম্মেল হক ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস এবং খুরশিদ জাহান হক ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতাল। স্বাস্থ্যশিক্ষার সম্প্রসারণ এবং দেশে ও দেশের বাইরে দক্ষ চিকিৎসক ও কারিগরি জনবল তৈরির লক্ষ্যে ইম্পেরিয়াল মেডিকেল কলেজ (প্রস্তাবিত) ও কেয়ার মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট (প্রস্তাবিত) প্রতিষ্ঠার কাজও চলছে।

প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত মোকাররম হোসেন। ৫৫ বছর বয়সী এই কর্মী অফিস সহকারী (পিয়ন) হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে নিজের মান উন্নয়ন করেছেন। বর্তমানে এক্স-রে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর স্মৃতিতে উঠে আসে প্রতিষ্ঠানটির শুরুর দিনের সংগ্রামের কথা। মোকাররম হোসেন বলেন, ‘অনেক মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও সহযোগিতার ফসল আজকের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন। গ্রামে গ্রামে লিফলেট বিলি করেছি আমরা। ভবন নির্মাণের সময় কেউ সিমেন্ট দিয়েছে, কেউ রড, কেউ দিয়েছে ইট। যে কিছুই দিতে পারেনি, সে এসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছে।’

কথায়–কথায় মোকাররম হোসেন বললেন, দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ থেকে ডিপ্লোমা নার্সিং সম্পন্ন করে তাঁর দুই মেয়েও এই প্রতিষ্ঠানে নার্স হিসেবে যোগ দিয়েছেন।

মানবিক উদ্যোগ

শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতেও সহযোগিতা করছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন। রোগীদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতাল থেকে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে। দ্ররিদ্র রোগীদের জন্য জাকাত ফান্ড (তহবিল) আছে, যেখান থেকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

চিকিৎসা করাতে এসে আর্থিক সহায়তা পাওয়া রোগীদের একজন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার আতাপুর গ্রামের বর্গা চাষি এমদাদুল হক। তিনি বুকের ব্যথা নিয়ে গত ৬ আগস্ট এই হাসপাতালে আসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, এমদাদুলের হৃদ্‌যন্ত্রে দুটি ব্লক রয়েছে। পরে তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রে রিং পরানো হয়। চার দিন হাসপাতালে থাকার পর এমদাদুলের বিল আসে ৭৫ হাজার ৪০০ টাকা। তাঁর পরিবারের পক্ষে পুরো টাকা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে হাসপাতালের জাকাত ফান্ড থেকে তাঁকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

এমদাদুলের শ্যালক ফেরদৌস বলেন, ‘আমরা খুবই খুশি হয়েছি। রোগী এখন ভালো আছে। হাসপাতাল থেকেই আর্থিক সহায়তা পেয়েছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সবাই খুব আন্তরিক ছিলেন। ডাক্তার সাহেবও অনেক সময় দিয়েছেন আমাদের।’

এমদাদুলের মতো অসহায় ও দুস্থ রোগীরা ৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পান এই হাসপাতাল থেকে। ২০১০ সালে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে জাকাত ফান্ড নামে একটি তহবিল গঠন করা হয়। স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি ছাড়াও কয়েকজন প্রবাসী এই তহবিলে অনুদান সংগ্রহ করে দেন।

হাসপাতালের রেজিস্টার দেখে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সামশির করিম জানান, জাকাত ফান্ড চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার রোগীকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে সহায়তা পেয়েছেন ৩২৭ জন। বছরে গড়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা এ খাতে ব্যয় হয়। তবে এ ক্ষেত্রে রোগীর আর্থিক দুরবস্থার খোঁজখবর নিয়ে তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সহায়তা দেওয়া হয়।

দিনাজপুর শহরে তিন দশক আগে যাত্রা শুরু হয় জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের

দক্ষ নার্স তৈরি হচ্ছে

২০১০ সালে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়। বর্তমানে বিএসসি নার্সিং (বেসিক), বিএসসি নার্সিং (পোস্ট বেসিক), ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি—এই চারটি কোর্স চালু রয়েছে। সম্প্রতি এমএসসি ইন নার্সিংয়ের দুটি কোর্স চালুর কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

কেয়ার নার্সিং ইনস্টিটিউটের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন প্রদীপ কুমার রায়। বর্তমানে তিনি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত।

প্রদীপ বলেন, ‘তখন অনেকটা না বুঝেই নার্সিং পড়তে গিয়েছিলাম। এখন বুঝি, কত ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নার্স ও মিডওয়াইফারি হিসেবে কাজ করছেন।’

২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ থেকে বিভিন্ন ধরনের কোর্স ও ডিগ্রি নিয়েছেন বলে জানান এই কলেজের সচিব শাহজাহান আলী। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের অনেকে দেশের বাইরে দক্ষ নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সেবা কার্যক্রম আরও বৃদ্ধির লক্ষ্য

তিন দশকের বেশি সময় আগে ভাড়া বাসায় শুরু হওয়া একটি ছোট উদ্যোগ আজ কয়েকটি হাসপাতাল, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ও নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কাঠামোয় দাঁড়িয়েছে। তবে রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। গত দেড় দশকে সরকারি কোনো অনুদান বা সহযোগিতা না পেয়ে স্থানীয় মানুষের সহায়তা ও বেসরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করেই প্রতিষ্ঠানটি এগিয়েছে। সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় অবহেলিত ছিল। ২০০৬ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। এই সময়ে স্থানীয় মানুষের অনুদান ও সহযোগিতায় সেবা কার্যক্রম চলেছে। হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এর সুফল পাবেন উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ।