চট্টগ্রাম থেকে কচুর লতি এখন আকাশপথে উড়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে, আবার জাহাজে ভেসে পৌঁছাচ্ছে আমেরিকা-ইউরোপেও। দুই দশক আগেও যা ছিল হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ছোট পরিসরের ব্যবসা, এখন তা ৬০ রপ্তানিকারকের হাত ধরে বিস্তৃত হয়েছে। সবুজ এ সবজিটি এখন জায়গা করে নিয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তালিকায়।
চিটাগাং ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. ইসমাইল চৌধুরী জানালেন, শুরুতে শুধু কুমিল্লার বরুড়ার কচুর লতি বিদেশে পাঠাতেন তাঁরা। এখন চট্টগ্রামের চিকন লতিরও চাহিদা বাড়ছে। প্রতি মাসে গড়ে দুই হাজার কেজি কচুর লতি বিদেশে পাঠানো হয়। বিমানে পাঠাতে প্রতি কেজিতে গড়ে ১৮০ টাকা খরচ পড়ে, আর বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়।
কেবল এই প্রতিষ্ঠান নয়, আরও অনেকে প্রতিষ্ঠান এখন কচুর লতি রপ্তানিতে সম্পৃক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে আকাশ ও সমুদ্রপথে প্রায় ২৫টি দেশে কচুর লতি রপ্তানি হচ্ছে। প্রতি মাসে গড়ে ৩৩ হাজার কেজি কচুর লতি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে মাসুদ অ্যাগ্রো প্রসেসিং ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড একাই প্রতি মাসে গড়ে ১৫ হাজার কেজি কচুর লতি বিদেশে পাঠায়। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা এ বি এম শামসুল করিম বলেন, জাহাজে পাঠাতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৩০ টাকা খরচ হয়। বিক্রি করতে পারেন গড়ে ২০০ টাকায়।
আরেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এস আর এন্টারপ্রাইজ মাসে অন্তত ৬০ হাজার কেজি কচুর লতি দুবাই ও কাতারে পাঠায়। সেখানে প্রতি কেজি লতি তাঁরা ২৫০ টাকায় ছাড়েন, যা খুচরা বাজারে গিয়ে দাঁড়ায় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়।
দুবাই শহরে ৮ বছর ধরে বসবাস করছেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা তুরাগ সেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাঝেমধ্যে কচুর লতি কিনে রান্না করেন। এক কেজি কেনা পড়ে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫০ টাকা।
সবচেয়ে বেশি কচুর লতি যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও শারজাহ শহরে। তবে চট্টগ্রামে চাষ কম হওয়ায় রপ্তানির ৭০ শতাংশই আসে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা থেকে। ওই এলাকার লতি সারা বছরই পাওয়া যায়, স্বাদেও আলাদা। বাকি ৩০ শতাংশ লতি আসে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, ফটিকছড়ি, আনোয়ারা ও পটিয়া উপজেলা থেকে।
রপ্তানির বিস্তার
চট্টগ্রাম থেকে কচুর লতি রপ্তানি শুরু হয় ১৯৯৭ সালে বিমানে, আর সমুদ্রপথে ২০০০ সাল থেকে। শুরুতে পরিমাণ ছিল নগণ্য। ২০১৩ সালের দিকে এসে রপ্তানি দ্রুত বাড়তে থাকে। গত পাঁচ অর্থবছরে (২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) আকাশপথে পাঠানো হয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার কেজি, সমুদ্রপথে গেছে ১৩ লাখ ৫৬ হাজার কেজি। অর্থাৎ পাঁচ বছরে মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ১৬ হাজার কেজি।
সবচেয়ে বেশি কচুর লতি যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও শারজাহ শহরে। তবে চট্টগ্রামে চাষ কম হওয়ায় রপ্তানির ৭০ শতাংশই আসে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা থেকে। ওই এলাকার লতি সারা বছর পাওয়া যায়, স্বাদেও আলাদা। বাকি ৩০ শতাংশ লতি আসে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, ফটিকছড়ি, আনোয়ারা ও পটিয়া উপজেলা থেকে। স্থানীয় কৃষকেরা যদি উৎসাহ পেতেন, তাহলে রপ্তানির ঝুলিতে চট্টগ্রামের কচুর লতির অংশ আরও বড় হতে পারত বলে মনে করেন রপ্তানিকারকেরা।
চট্টগ্রামের রপ্তানিকারক সংগঠন চিটাগাং ফ্রেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ইসমাইল চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের চিকন কচুর লতি রপ্তানি হচ্ছে। তবে পরিমাণে এখনো কম। কৃষককে প্রণোদনা দিলে উৎপাদন বাড়বে, রপ্তানিও বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে বছরে এই লতি রপ্তানি করে প্রায় ৭ কোটি টাকা দেশে আসে, প্রতি কেজির রপ্তানিমূল্য গড়ে ১৮০ টাকা ধরে।’
উৎপাদন কমেছে ৪২ শতাংশ
কচুর লতি চাষে পানির প্রাচুর্য দরকার। আর এ কারণেই চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলগুলো কচুর লতি চাষের জন্য উপযোগী। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্রের নোনাপানি মার্চ-এপ্রিলে নদী ও খালে ঢুকে পড়ছে। এতে জমির ফসল নষ্ট হয়। কৃষকেরা ধান বা অন্য সবজির দিকে ঝুঁকছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে চট্টগ্রামের ১ হাজার ৬৪ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ২৯ হাজার ৭৯২ টন কচুর লতি। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জমির পরিমাণ নেমে এসেছে ৮৩৬ হেক্টরে, উৎপাদনও কমে ১৭ হাজার ২০০ টনে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ বছরে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৪২ শতাংশ।
চট্টগ্রামে কচুর লতি কম উৎপাদন হলেও বিদেশি বাজারে এর অবস্থান শক্ত। বিশেষ করে চিকন লতির চাহিদা বাড়ছে। তবে উৎপাদন বাড়াতে সঠিক পরামর্শ, আর্থিক সহায়তা আর সেচব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন কৃষকেরা।
কর্ণফুলীর মইজ্জারটেক এলাকার কৃষক রাজ্জাক হোসেন এক সময় কচুর লতি চাষ করতেন। কিন্তু কয়েক মৌসুম লোকসান গুনে এখন তিনি সেই চাষ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘বৃষ্টিপাত কম হলে কর্ণফুলীতে নোনাপানি চলে আসে। খাল হয়ে জমিতেও ঢুকে পড়ে পানি। ২০২৩ সালে লতি চাষে খরচই ওঠাতে পারিনি। তাই এ বছর উৎপাদন করিনি।’
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিলে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। ফলে কচুর লতি চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকেরা ঝুঁকছেন বিকল্প ফসলে। তবে লতি চাষের নানা পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের নিয়মিত জানাচ্ছেন। উৎপাদন বাড়াতে ইতিমধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন।