কক্সবাজারের এই গ্যাস পাম্পে গতকাল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।। আজ দুপুরে তোলা
কক্সবাজারের এই গ্যাস পাম্পে গতকাল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।। আজ দুপুরে তোলা

কক্সবাজারে বিস্ফোরণ

উদ্বোধনের এক দিন পরই গ্যাস পাম্পে দুর্ঘটনা, ছিল না ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশের ছাড়পত্র

কক্সবাজার শহরের বাইপাস সড়কে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটা গ্যাস পাম্পটি গত মঙ্গলবার উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনের পরদিন গতকাল বুধবার রাতে পাইপ লাইন ফুটো হয়ে সেখানে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া সতর্কতা না মেনে জনবহুল স্থানে এটি চালু করা হয়েছিল। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি। এ ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

তবে ‘কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন’ নামে গ্যাস পাম্পটির মালিক রামুর বাসিন্দা এন আলম দাবি করেছেন, পাম্পের ছাড়পত্র আছে। তদন্ত কমিটির কাছে কাগজপত্র যথাসময়ে উপস্থাপন করবেন তিনি। ব্যবসা-বাণিজ্য থাকলে দুর্ঘটনা ঘটবে উল্লেখ করে এন আলম আরও বলেন, আগুনে যাঁরা দগ্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের পাশে আছেন তিনি।

গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাইপাস সড়কের ওই গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ঘরবাড়িসহ নানা প্রতিষ্ঠানে। আগুনে ৩০টির মতো গাড়ি, চারটি বাড়িসহ নানা অবকাঠামো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনে দগ্ধ হন অন্তত ১৬ জন। এর মধ্যে ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট এবং ৩ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

চট্টগ্রামে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া ছয়জন হলেন, আদর্শগ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের, মো. সিরাজ, আবদুর রহিম, মো. সাকিব, মোতাহের হোসেন ও আবুল কাশেম। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছয়জন রোগীর শরীরের ২০ থেকে ৯০ শতাংশ পুড়েছে। সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক।’ সেনা-বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসের পৃথক ৯টি ইউনিট টানা পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টার পর গতকাল দিবাগত রাত দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

সেনা ও বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসের পৃথক ৯টি ইউনিট টানা পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টার পর গতকাল দিবাগত রাত দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

গ্যাস পাম্পের এই পাইপ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আজ দুপুরে তোলা

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে,শহরের জনবহুল এলাকায় ওই গ্যাস পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাম্পটির আশপাশে আদর্শগ্রাম, চন্দ্রিমা হাউজিং ও পুলিশ লাইনস এলাকায় অন্তত ২০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এমন জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস পাম্প নির্মাণ, আগুনের সূত্রপাত এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বলা যাবে গ্যাস পাম্পটি কীভাবে তৈরি হলো।

যেভাবে বিস্ফোরণ, আগুন

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরের কলাতলীর হোটেল মোটেল জোনের পূর্ব দিকে বাইপাস সড়কের আদর্শগ্রামে (চন্দ্রিমা হাউজিং এ প্রবেশের মুখে) নির্মিত হয় গ্যাস পাম্পটি। গতকাল সন্ধ্যায় পাম্পের ট্যাংক থেকে ফুটো দিয়ে গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন ধরে যায়। পাম্পের কর্মচারীরা বালু ও পানি ছিটিয়ে তা নেভান। পরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আবার আগুন ধরে যায়। সেই আগুন চারদিকে ছড়াতে থাকে।

শহরের জনবহুল এলাকায় ওই গ্যাস পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাম্পটির আশপাশে আদর্শগ্রাম, চন্দ্রিমা হাউজিং ও পুলিশ লাইনস এলাকায় অন্তত ২০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এমন জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

রাত সাড়ে ১১টায় ঘটনাস্থলে কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে বলেন, রাত সাড়ে নয়টার দিকে ওই গ্যাস পাম্পের ট্যাংকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং পুনরায় আগুন ধরে যায়। এই আগুন দ্রুত লোকজনের ঘরবাড়ি, গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ ও পার্কিংয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ঘটনায় গ্যাস পাম্পের পাশে থাকা একটি গ্যারেজ ও পার্কিংয়ে রাখা অন্তত ৩০টি গাড়ি পুড়ে গেছে। গাড়িগুলো গ্যারেজে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছিল। গ্যারেজের কর্মচারী নুরুল আলম বলেন, পাম্প থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে একে একে ৩০টির বেশি প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও পর্যটক বহনের খোলা জিপ পুড়ে গেছে। একটি জিপ গাড়ির মালিক শামসুদ্দীন বলেন, ৮ লাখ টাকা খরচ করে তিনি পর্যটক পরিবহনের জন্য জিপ গাড়িটি তৈরি করে পার্কিংয়ে রাখেন। আগামী ঈদুল ফিতরের ছুটিতে এই গাড়ি চালানোর কথা ছিল। কিন্তু মধ্যরাতের আগুনে তাঁর জিপসহ অন্তত ২৪টি জিপ গাড়ি পুড়ে ছাই হলো। লোকালয় এবং আবাসিক এলাকা থেকে গ্যাস পাম্প সরানো উচিত।

গতকাল মধ্য রাতে ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ৯টি ইউনিটের যৌথ প্রচেষ্টায় রাত পৌনে দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অগ্নিদগ্ধ ১০ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দগ্ধ ৯ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর আহত লোকজনকে সরিয়ে নিচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। গতকাল রাতে তোলা

পাম্প বন্ধ ও সরানোর দাবি

আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গ্যাস পাম্প এলাকায় জড়ো হতে থাকেন পরিবেশ কর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধিসহ শ্রেণি–পেশার মানুষ। তাঁদের দাবি ব্যস্ততম একটি সড়কের পাশে জনবহুল এলাকা থেকে ওই গ্যাস পাম্পটি উচ্ছেদের দাবি জানান।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদ সভাপতি দীপক শর্মা বলেন, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে—পাম্প নির্মাণের বিপরীতে মালিক পক্ষ পরিবেশ ছাড়পত্র নেননি, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদনও নেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে পাম্পটি সরিয়ে না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও কলাতলীর বাসিন্দা জিসান উদ্দিন বলেন, এমন জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু আগুনে দগ্ধ লোকজনের চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই কক্সবাজারে। দগ্ধ লোকজনকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার বার্ন ইউনিটে পাঠাতে হয়। তাতে পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটে।

দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। তাঁর কাছেও স্থানীয় লোকজন পাম্পের গ্যাস বিক্রি বন্ধ ও তা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।

বেলা ১১টার দিকে গ্যাস পাম্প পরিদর্শন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান খান। ঘটনাস্থলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন নামে গ্যাস পাম্পে গতকাল রাতে ফুটো থেকে দুর্ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসন আগুন নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ না নিলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। ঘটনার আসল রহস্য উদ্‌ঘাটনে তিন সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, গ্যাস পাম্পটির বৈধ অনুমোদন নেই বলে শোনা গেছে, তদন্তে তা বেরিয়ে আসবে। আমরা মালিকপক্ষকে এখানে (পাম্পে) দেখছি না। তাদের বক্তব্য শোনা দরকার, কাগজপত্র পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা দরকার।

গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ি। আজ দুপুরে তোলা

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, গ্যাস পাম্পটি নির্মাণের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নেওয়া হয়নি। পাম্প মালিক এন আলমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, গ্যাসের ফুটো থেকে বিস্ফোরণ ও আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গ্যাস ফুটো বন্ধে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, গ্যাস পাম্প নির্মাণের বিপরীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কি না, এই মুহূর্তে তাঁর মনে পড়ছে না। তিনি ঢাকাতে অবস্থান করছেন। তবে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন না থাকলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও থাকার কথা নয়।