
ছোটবেলা থেকেই পাখি ভালোবাসতেন খাগড়াছড়ির স্নাতকের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হামিম। মায়ের দেওয়া হাতখরচ বাঁচিয়ে চারটি কোয়েল পাখি কিনেছিলেন। এখন শহরের কদমতলী এলাকায় এক হাজার কোয়েল, ১১ জাতের মুরগি, ৮ জাতের কবুতর, দুই জাতের ঘুঘু আর ১৬টি ছাগল নিয়ে বড় খামার গড়েছেন। পরিচিতি পেয়েছেন সফল খামারি হিসেবে।
মায়ের দেওয়া হাতখরচ বাঁচিয়ে চারটি কোয়েল পাখি কিনেছিলেন তিন বছরের বেশি সময় আগে। মোহাম্মদ হামিমের শুরুটা এভাবেই। তখনো জানতেন না হাতখরচের টাকায় শুরু করা উদ্যোগটা এত বড় হয়ে উঠবে। খাগড়াছড়ির কদমতলী এলাকায় এক হাজার কোয়েল পাখি, ১১ জাতের মুরগি, ৮ জাতের কবুতর, দুই জাতের ঘুঘু আর ১৬টি ছাগল নিয়ে বড় খামার গড়েছেন। পরিচিতি পেয়েছেন সফল খামারি হিসেবে।
হামিম খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা আব্দুল বাতেন। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই হামিম স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের কিছু করার ইচ্ছা থেকেই তিনি খামার গড়ার পথে হাঁটেন। খামার থেকে এই শিক্ষার্থী বর্তমানে প্রতি মাসে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করেন।
সম্প্রতি হামিমের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, উঠানেই ছাগলের খামার। একটু সামনে বড় একটি কোয়েল শেড। চারপাশে কবুতরের ঘর। সেমিপাকা বাড়ির ভেতরের তিনটি কক্ষ ও বারান্দায় রয়েছে নানা জাতের মুরগি, ঘুঘু, কবুতর আর পার্শিয়ান বিড়াল। পুরো বাড়িটা যেন ছোট একটা চিড়িয়াখানা।
হামিম বলেন, ছোটবেলা থেকেই পশুপাখির প্রতি তাঁর আলাদা ভালোবাসা ছিল। তাঁর বাবাও আগে কবুতর পালন করতেন। বাবাকে দেখেই পাখির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। সুযোগ পেলে নিজেও কিছু করবেন এই ভাবনা থেকেই খামারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
২০২২ সালে তাঁর শখ হয় কোয়েল পাখি পোষার। তখন নিজের হাতে তেমন টাকা ছিল না। মা যে হাতখরচ দিতেন, তার সবটুকু খরচ না করে অল্প অল্প করে জমাতে থাকেন। ১৮০ টাকা দিয়ে চারটি কোয়েল পাখি কিনেছিলেন।
কোয়েল দিয়ে শুরু হলেও হামিম এখন নানা জাতের পাখি ও মুরগি পালন করছেন। তাঁর খামারে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার কালো আয়াম সেমানি, বিশ্বের বড় আকারের ব্রাহমা, চীনের কোচিন, মালয়েশিয়ার ছোট সেরেমা, ভারতের কালো মাংসের কাদাকনাথসহ নানা জাতের মুরগি। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের ‘হেজা’ ও ‘লাইজ্জা’ মুরগিও রয়েছে।
হামিম বলেন, তখন বুঝতেই পারেননি এই চারটি পাখিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোয়েলগুলো ডিম দেওয়া শুরু করে। আশপাশের মানুষজন আগ্রহ নিয়ে ডিম কিনতে থাকেন। ডিম বিক্রি করে যে টাকা আসত, সেটাই আবার জমাতেন হামিম। নিজের জমানো টাকার সঙ্গে সেটুকু যোগ করে একসময় ১০০টি কোয়েল কিনে ছোট আকারে খামার গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে খামার বড় হতে থাকে। সব মিলিয়ে খামারে বিনিয়োগ আছে চার লাখ টাকার মতো। বর্তমানে তাঁর খামারে প্রায় এক হাজার কোয়েল পাখি রয়েছে। নিয়মিত ডিম ও মাংস বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় বাজারে।
হামিম বলেন, কোয়েল পাখির খাবার কম লাগে, জায়গা কম লাগে এবং দ্রুত ডিম দেয়। তাই অল্প পুঁজি নিয়ে যাঁরা কিছু করতে চান, তাঁদের জন্য কোয়েল পালন ভালো একটি সুযোগ।
কোয়েল দিয়ে শুরু হলেও হামিম এখন নানা জাতের পাখি ও মুরগি পালন করছেন। তিনি বই পড়ে এবং ইউটিউব দেখে বিশ্বের বিভিন্ন জাতের পাখি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। তাঁর খামারে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার কালো আয়াম সেমানি, বিশ্বের বড় আকারের ব্রাহমা, চীনের কোচিন, মালয়েশিয়ার ছোট সেরেমা, ভারতের কালো মাংসের কাদাকনাথসহ নানা জাতের মুরগি। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের ‘হেজা’ ও ‘লাইজ্জা’ মুরগিও রয়েছে।
‘অনেক টাকা না থাকলেও ইচ্ছা আর ধৈর্য থাকলে কিছু করা যায়। অনেকে মনে করে ব্যবসা করতে অনেক টাকা লাগে। আমি দেখাতে চাই, হাতখরচ থেকেও খামার গড়া সম্ভব।’মোহাম্মদ হামিম, খামারি ও খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
নানা জাতের কবুতর ও ঘুঘুও রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। মোসালদম, রেসার, গিরিবাজ, লুটন, বোম্বাইসহ দেশি-বিদেশি কবুতর পালন করছেন তিনি। আছে অস্ট্রেলিয়ান ঘুঘু, ইউরোপিয়ান কোয়েল, জাপানি কোয়েল ও ছোট আকৃতির কিং কোয়েলও।
এক বছর ধরে হামিম ছাগল পালনেও যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁর খামারে ১৬টি ছাগল রয়েছে। তিনি মনে করেন, একাধিক খাত থাকলে আয় বাড়ে এবং ঝুঁকিও কমে। তাঁর নিজের একটি ইনকিউবেটর আছে। ডিম থেকে কোয়েলের বাচ্চা ফুটিয়ে সেগুলোও বিক্রি করছেন তিনি।
পড়াশোনার পাশাপাশি খামার সামলানো সহজ নয়। তবে হামিম বলেন, পরিকল্পনা আর পরিশ্রম থাকলে দুটোই একসঙ্গে করা যায়। এ কাজে মা–বাবা সব সময় পাশে ছিলেন। তাঁদের সহযোগিতা না পেলে এত দূর আসা সম্ভব হতো না বলেও জানান তিনি।
হামিম বলেন, তিনি শুধু চাকরির পেছনে দৌড়াতে চান না। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে চান। ভবিষ্যতে খামার আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি বিশ্বাস করেন, অনেক টাকা না থাকলেও ইচ্ছা আর ধৈর্য থাকলে কিছু করা যায়। হামিম বলেন, ‘অনেকে মনে করে ব্যবসা করতে অনেক টাকা লাগে। আমি দেখাতে চাই, হাতখরচ থেকেও খামার গড়া সম্ভব।’
খাগড়াছড়ি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জুলফিকার আলী বলেন, ‘হামিম তরুণদের জন্য একজন আদর্শ। তিনি তাঁর পশুপাখি নিয়ে বিভিন্ন মেলায় অংশ নিচ্ছেন। গত বছরের নভেম্বরে প্রাণী সপ্তাহে তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তাঁর সংগ্রহে অনেক পাখি আছে। প্রয়োজন হলে আমরা তাঁকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’