নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি
নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি

যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থী হত্যা

‘বৃষ্টি, মানুষ কি এভাবেও হারিয়ে যেতে পারে’

‘বৃষ্টি, মানুষ কি এভাবেও হারিয়ে যেতে পারে? এত এত সতেজ মেমোরিজ তোকে নিয়ে, তুই ছাড়া সারা জীবন এসব কীভাবে মনে রাখব?’—যুক্তরাষ্ট্রে খুন হওয়া বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে এসব কথা লিখেছেন ফারাজানা হক।

বৃষ্টি ও ফারজানা দুজনই একসঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তাঁরা। কেবল ফারজানা নন, নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যার খবরে অনেকটাই বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য সহপাঠীরাও। তাঁদের কেউ ছুটেছেন ঢাকায় বৃষ্টির পরিবারের সদস্যদের কাছে, কেউ আবার বৃষ্টিকে নিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণা করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ফারজানা হক ফেসবুকে লেখেন, ‘কী অসহ্য কষ্ট লাগতেছে। শেষ এমন কষ্ট পাইছিলাম আমার ছোট বোনকে হারিয়ে। তুই চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে কোনো বান্ধবী না, নিজের আপন একটা বোন হারিয়ে ফেলছি।’

বৃষ্টি সব সময় হাসিখুশি থাকত। শুধু পড়ালেখায় নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাতেও ছিল তার সরব উপস্থিতি। এত প্রাণচঞ্চল একজন আমাদের মাঝে নেই, বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে। সহপাঠীদের সবাই তার মৃত্যুর খবরে শোকাহত।
মো. সোলেমান মিয়া, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ২০২৩ সালে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি থাকতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের (বর্তমান নাম জুলাই শহীদ স্মৃতি ছাত্রী হল) ২১২ নম্বর কক্ষে। একই হলেই থাকতেন তাঁর সহপাঠী ফারজানা হক।

নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির আরেক সহপাঠী মো. সোলেমান মিয়া থাকেন নারায়ণগঞ্জে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওর ভাইয়ের ফেসবুক পোস্ট থেকে বৃষ্টির মৃত্যুর খবর প্রথমে জানতে পারি। প্রথমেই কিছুতেই খবরটি বিশ্বাস হচ্ছিল না। পরে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হই। গতকাল শনিবার বিকেলে ঢাকার মিরপুরে ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। যদিও জানি, তাঁরা যা হারিয়েছেন, কোনো সান্ত্বনাই তাঁদের জন্য যথেষ্ট নয়।’

মো. সোলেমান মিয়া আরও বলেন, ‘বৃষ্টি সব সময় হাসিখুশি থাকত। শুধু পড়ালেখায় নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাতেও ছিল তার সরব উপস্থিতি। এত প্রাণচঞ্চল একজন আমাদের মাঝে নেই, বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে। সহপাঠীদের সবাই তার মৃত্যুর খবরে শোকাহত।’

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাহিদা সুলতানাদের কোর্স কো-অর্ডিনেটর ছিলেন অধ্যাপক ফাতেহা নূর রুবেল। তিনি বর্তমানে ওই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে এই শিক্ষক বলেন, ‘বৃষ্টি খুবই মেধাবী, ভদ্র ও মিশুক প্রকৃতির ছিল। শ্রেণিকক্ষেও ছিল বেশ মনোযোগী। গণমাধ্যমের খবরে তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুনেছি। ঘটনাটি জানার পর মন খুব খারাপ হয়ে গেছে।’

১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নিখোঁজ হন নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি এবং জামিল আহমেদ লিমন নামের আরেক তরুণ। দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন। ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন লিমন। অন্যদিকে বৃষ্টি পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার দুজনকে সর্বশেষ ক্যাম্পাসে দেখা গিয়েছিল। গত শুক্রবার জামিলের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের কথা জানায়। তাঁদের নিখোঁজের ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের এক মার্কিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁর বাড়ি থেকে। নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান জানান, বৃষ্টি বেঁচে না থাকার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ তাঁদের নিশ্চিত করেছে। তবে বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার হয়নি।