
সেই গাঁয়ে ছিল স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর ছাত্র ও সহকর্মীর বাড়ি। বাড়ি ছিল বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর এক ছাত্রেরও। গ্রামটি ভারতবিখ্যাত চিত্রশিল্পী শশীভূষণ পালের জন্মস্থান।
তাঁর নামে ব্রিটিশ আমলেই এখানে গড়ে উঠেছিল আর্ট স্কুল। বলা হয়, এটি বাংলার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। তখনই গাঁয়ে ছিল একটি কৃষি কলেজ। গাঁয়ের ছেলে হয়েছিলেন রায় বাহাদুর। তারপর আর সেই গাঁয়ের পরিচয় কি শুধু গাঁয়ের মধ্যে থাকে!
বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই গাঁয়ের নাম ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতে। ১৯২৮ সালে সেই গাঁয়ের নামে কলকাতা থেকে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হলো। গাঁয়ের নাম মহেশ্বরপাশা। তাই লেখক খগেন্দ্রনাথ বসু বইটির নাম দেন মহেশ্বরপাশা পরিচয়। ৩৫৮ পৃষ্ঠার এই বইয়ের দাম ছিল ৩ টাকা। কলকাতার শ্রীরাম প্রেস থেকে সারদাপ্রসাদ মণ্ডল বইটি প্রকাশ করেন।
বর্তমানে মহেশ্বরপাশা খুলনা মহানগরের একটি মহল্লা। পুস্তকটির পূর্বকথনে বলা আছে, মহেশ্বরপাশা খুলনার একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম। শহর থেকে পাঁচ মাইল উত্তরে অবস্থিত। আগে এটি সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছেন যশোহর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থের লেখক এবং দৌলতপুর কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক সতীশচন্দ্র মিত্র। তিনি দীর্ঘ ভূমিকার শুরুতেই বলেছেন, ‘জননী-জঠর হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়া মানবশিশু জননী ও জন্মভূমিকেই প্রথম চিনে, প্রথম ভালোবাসে। মানুষ হইতে হইলে স্বদেশকে চিনিতে হয়। যাহাতে চিনাইয়া দেয়, সেই শাস্ত্রের নাম ইতিহাস।’ ভূমিকা থেকে জানা যায়, চাঁচড়ার রাজসরকারের কর্মচারী মহেশ্বর ঘোষ এই গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর নামেই গ্রামের নাম হয় মহেশ্বরপাশা।
গ্রন্থকারের নিবেদনে লেখক বলেছেন, ‘পূর্বে প্রতি সন্ধ্যায় প্রত্যেক পরিবারের প্রাচীনগণ বালকদের অন্যান্য পাঠের সহিত বংশের অন্তত সাতপুরুষের নাম মুখস্থ করাইতেন। কিন্তু সেদিন আর নাই। তার শিক্ষিতের নিদারুণ অধোগতি।’ এই গ্রন্থে গ্রামের ৬০ পরিবারের বংশপরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে আরও বিশিষ্ট ২০ ব্যক্তির জীবনী।
বর্তমানে মহেশ্বরপাশা খুলনা মহানগরের একটি মহল্লা। পুস্তকটির পূর্বকথনে বলা আছে, মহেশ্বরপাশা খুলনার একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম। শহর থেকে পাঁচ মাইল উত্তরে অবস্থিত। আগে এটি সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বইটিতে মোটা চকচকে পেপারে মোট ৩৮টি ছবি ছাপা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কয়েকটি বাড়ি, পুকুর, দিঘি ও প্রতিষ্ঠান। বাকিগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি।
বাংলাদেশে আর কারও কাছে এই বইয়ের কোনো কপি আছে কি না, জানা যায় না। তবে সুব্রত মজুমদার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বইখানা যত্নে রেখে দিয়েছেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের গণিত বিভাগ থেকে অবসর নিয়েছেন। বয়স এখন ৮২ বছর। তাঁর ঠাকুরদাদা শরৎ চন্দ্র মজুমদার প্রেসিডেন্সি কলেজে স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর ছাত্র ও সহকর্মী ছিলেন। মহেশ্বরপাশা গ্রামে শরৎ চন্দ্রের জন্ম হয়েছিল ১৮৬৭ সালে। তাঁর বড় ভাই কেদারনাথ মজুমদার ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।
তাঁর নামে গ্রামে এখনো সড়ক আছে। তাঁর (কেদারনাথ) ছেলে নলিনী নাথ মজুমদার রায় বাহাদুরের স্ত্রী মহিলা সুন্দরী মজুমদার কবি ছিলেন। সুব্রত মজুমদারের বাবা সুবোধচন্দ্র মজুমদার বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর ছাত্র ছিলেন। পরিবারের আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের পরিচয় এ রকমই। তাঁদের ছবিসহ এই গল্প রয়েছে বইটিতে। গ্রামের ছেলে ইব্রাহিম হোসেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। খুলনা থেকে বিদায়কালে ফুলের মালাপরা ছবিটি রয়েছে।
আছে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী শশীভূষণ পালের ছবি। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘গ্লাসগো প্রদর্শনীতে তিনি ভারতবর্ষ, বার্মা ও সিংহল বিভাগের মধ্যে প্রথম, একই কৃতিত্ব অর্জন করেন ফ্রাঙ্কো-ব্রিটিশ প্রদর্শনীতেও।’
এসব প্রদর্শনীতে প্রখ্যাত সব শিল্পকর্ম স্থান পায়। আরও বলা আছে, ‘খুলনায় যিনি যখনই ম্যাজিস্ট্রেট হইয়া আসিয়াছেন, তিনি শশীভূষণের কীর্তিকাহিনী শুনিয়া তাঁহার বাড়িতে পদার্পণ করিয়া তাঁহার অঙ্কিত ছবি দর্শনে মুগ্ধ হইয়াছেন, অযাচিতভাবে প্রশংসাপত্র দিয়াছেন।
তিনিই ব্যক্তি উদ্যোগে মহেশ্বরপাশায় “স্কুল অব আর্ট” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯২২ সালের বাংলার তৎকালীন গভর্নর লর্ড লিটন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে স্টিমারে চড়ে সেই স্কুল দেখতে এসেছিলেন। এসেছিলেন বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতবও। ৪০ বছর ধরে শশীভূষণ পাল এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।'
জন্মের ১৩ বছর আগে ছাপা হওয়ার কারণে সুব্রত মজুমদারের নাম এই বইয়ে ওঠেনি। বর্তমানে তাঁর রাজশাহীর বিহাসের বাসায় বইখানা সযত্নে রেখেছেন। তিনি ও তাঁর স্ত্রী দুই দিন এই বই নিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে বাড়ির সব কাজ ফেলে দীর্ঘ সময় দেন। ইচ্ছেমতো বইয়ের ছবি তুলে নেওয়ার অনুমতি দেন; কিন্তু এক বেলার জন্য বইখানা হাতছাড়া করতে রাজি হননি।
বইটিতে সুব্রত মজুমদারের ‘আনন্দধাম’ নামের পৈতৃক বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপের ছবি রয়েছে। ২০১৭ সালের দিকে তিনি সেই বাড়ি দেখতে মহেশ্বরপাশায় গিয়ে ভীষণ আহত হয়েছেন। আনন্দধামের চিহ্নমাত্র নেই। সেখান থেকে আর তিনি সামনে এগোতে পারেননি। ফিরে এসেছেন। স্মৃতি হিসেবে হয়তো বইখানাই আঁকড়ে ধরে থাকতে চান। বিদায়বেলায় উঠে দাঁড়ালেন বইখানা বুকের কাছে ধরেই।